দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল উন্নয়ন প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একের পর এক আর্থিক অনিয়মের তথ্য সামনে আসছে। আলোচিত বালিশ-কাণ্ডের পর এবার বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (ফাপাড) এক বিশেষ নিরীক্ষায় প্রকল্পটিতে বড় ধরনের দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে।
বিগত ৯ অর্থবছরে প্রকল্পটিতে ব্যয় হওয়া প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত করেছেন নিরীক্ষকরা। হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটিতে খরচ হওয়া প্রতি তিন টাকার মধ্যে প্রায় এক টাকার হিসাব নিয়ে আপত্তি উঠেছে। একই সঙ্গে এই সময়ে প্রকল্পে মোট ২৩০টি অডিট আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২০টিই রাশিয়ার নাগরিকদের জন্য নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে।
আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সংস্থাটির পরিদর্শন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর কোনো হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা প্রকল্প কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। এছাড়া অসমাপ্ত কাজের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকাও সেখানে সংরক্ষণ করা হয়নি। ফাপাডের বিশেষ নিরীক্ষা এবং আইএমইডির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
২০১৬ সালের জুলাই মাসে দুই ইউনিটে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শুরু হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও পরবর্তীতে এর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা পরবর্তীতে ২২ শতাংশ বৃদ্ধি করে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এই মোট ব্যয়ের মধ্যে বিগত ৯ বছরে খরচ হয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা।
ফাপাডের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ২৩০টি অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রথম পাঁচ অর্থবছরেই ৪১ হাজার ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ৮ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছিল। এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরে আপত্তির পরিমাণ ছিল ১০৬ কোটি টাকা, যা পরের বছর বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকায়।
সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ধরা পড়েছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে; ওই বছর ১৬ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ১৫ হাজার ২০৭ কোটি টাকার অডিট আপত্তি তোলা হয়। এছাড়া সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ৩ হাজার Count ৬৯৬ কোটি টাকার অডিট আপত্তি রয়েছে।
এই বিশাল অনিয়মের বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারিগরি প্রযুক্তি সরবরাহ ও ঋণদাতা দেশ রাশিয়া শুধু একটি পারমাণবিক পরাশক্তিই নয়, বৈশ্বিক দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ অবস্থানে রয়েছে। দেশটি চরম উদ্বেগজনক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হিসেবে চিহ্নিত। এই বাস্তবতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে আপাদমস্তক যোগসাজশের দুর্নীতিসহ ব্যাপক অনিয়ম যেমন অস্বাভাবিক নয়, তেমনই প্রতারণামূলকভাবে চুক্তির শর্তভঙ্গের ঘটনাও বিস্ময়কর নয়।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি যখন অনুমোদিত ও চুক্তি সম্পাদিত হয়, তখন সংশ্লিষ্টদের রাশিয়া ও রোসাটম সম্পর্কে জানার সুযোগ ছিল এবং বর্তমানেও তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছে সেটি অজানা নয়। পতিত কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া এই বিশাল বোঝা লাঘবের জন্য নিরীক্ষায় চিহ্নিত অনিয়মের যথাযথ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং অবশিষ্ট কাজের প্রতিটি ধাপে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতি প্রতিরোধব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বিশেষ নিরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে রূপপুর প্রকল্পের আওতায় নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন এলাকায়। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত এই আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ২৩০টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১২০টি আপত্তি তোলা হয়েছে। এসব আপত্তির বড় অংশই নির্মাণকাজ, যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনা এবং বিল পরিশোধসংক্রান্ত।
নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনায় সরকারি মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দরপত্রে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেখানো হলেও অন্যকিছু পণ্যের দাম কম দেখিয়ে মোট দরকে গ্রহণযোগ্য রাখা হয়েছে, যাতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের আড়ালে অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
অনিয়মের অন্যতম বড় উদাহরণ গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর ক্রয়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা, অথচ বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু এই একটি খাতেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা।
একটি ভবনের হিসাবেই এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়; যেখানে উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম, ট্রান্সফরমার, নিম্ন ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন প্যানেল এবং জেনারেটরের সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, সেখানে বিল করা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এতে একটি ভবনেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত অনিয়ম ছিল বালিশ কেনা। বিশেষ নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রকল্পে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনা হয়, যার মধ্যে ৬০টি বালিশের প্রতিটির দাম ধরা হয় ৮৯ হাজার noble টাকা। বালিশগুলোর প্রকৃত মূল্য ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, অথচ এগুলো কেনা হয় ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায়। এতে সরকারের প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
তবে বিশেষ নিরীক্ষার তথ্য বলছে, বালিশকাণ্ড ছিল অনিয়মের একটি ছোট অংশ মাত্র। গ্রিন সিটির ২০টি আবাসিক ভবনের নির্মাণ ও ক্রয় কার্যক্রম পর্যালোচনা করে নিরীক্ষকরা ২৯৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির তথ্য তুলে ধরেছেন, যেখানে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, মূল্য নির্ধারণে অসংগতি এবং চুক্তির শর্ত অনুসরণ না করার অভিযোগ করা হয়েছে।
আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি। তাদের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা যায়নি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের ক্ষেত্রেও একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের প্রতিবছর বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ২০১২ সালের ডিসেম্বরের পর প্রতিষ্ঠানটি আর কোনো কর্মপরিকল্পনা জমা দেয়নি। প্রকল্প দপ্তর থেকে একাধিকবার তাগিদ দেওয়া হলেও নতুন কর্মপরিকল্পনা পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় আইএমইডি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দ্রুত হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা সংগ্রহ, প্রকল্পের সব অসমাপ্ত কাজের তালিকা প্রস্তুত, নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করেছে।
এই সমস্ত বিষয়ে জানতে চাইলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, এত বড় অঙ্কের অডিট আপত্তি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিধিগত দুর্বলতার বিষয়টি প্রকাশ করে।
বিশেষ করে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) পরিপালনে দুর্বলতা ছিল বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যদি ক্রয় প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হতো, তাহলে এত অডিট আপত্তি হওয়ার কথা নয়।
তিনি আরও বলেন, এটিকে শুধু প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা হিসেবে দেখলে হবে না, এটি প্রকল্প তদারকি ও সুপারভিশনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত। মন্ত্রণালয়ের স্টিয়ারিং কমিটি এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরও নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল ক্রয়প্রক্রিয়া আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না। যেহেতু এসব সিদ্ধান্ত তাদের অনুমোদনের মধ্য দিয়েই হয়েছে, তাই দায়ও তাদের এড়ানোর সুযোগ নেই।
বালিশ-কাণ্ড ছিল কেবল শুরু : রূপপুর প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত অনিয়ম ছিল বালিশ কেনা। বিশেষ নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রকল্পে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনা হয়। এর মধ্যে ৬০টি বালিশের প্রতিটির দাম ধরা হয় ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা। বালিশগুলোর প্রকৃত মূল্য ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অথচ এগুলো কেনা হয় ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায়। এতে সরকারের প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়।
Leave a Reply