এস আলম গ্রুপের সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা পাচারের তথ্য বিএফআইইউর প্রতিবেদনে
- আপডেট সময় : ১০:২৬:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ২৯ বার পড়া হয়েছে
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন অনিয়ম ও অর্থ পাচারের চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বার্ষিক প্রতিবেদনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই প্রতিবেদনে ‘এস গ্রুপ’ ছদ্মনামে একটি কেস স্টাডি প্রকাশ করা হয়, যা মূলত এস আলম গ্রুপ বলে নিশ্চিত করেছেন বিএফআইইউর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। রাজনৈতিক প্রভাব ও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে ৭টি ব্যাংক ও ১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নামে-বেনামে প্রায় সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করেছে এই শিল্পগোষ্ঠী।
বিএফআইইউর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের জন্য গ্রুপটি মূলত ব্যাংকের তহবিলের অপব্যবহার, বন্ডের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি পদের অপব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের কারসাজির মতো কৌশলগুলো ব্যবহার করেছে। সংস্থাটি একে দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও পদ্ধতিগত ব্যর্থতার চরম দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জালিয়াতিপূর্ণ ঋণ, নিয়ন্ত্রণমূলক আইন লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এই বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়।
ব্যাংক দখল ও পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুপরিকল্পিতভাবে এস আলম গ্রুপের পরিবারের সদস্যরা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়। পরবর্তীতে তাদের বিশ্বস্ত পারিবারিক সদস্য ও অনুগত সহযোগীদের এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বসিয়ে অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করা হয়। এমনকি দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতেও তারা রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সংযোগ ব্যবহার করেছিল। এরপর ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়মকানুন নিজেদের সুবিধামতো পরিবর্তন করে কোনো তদারকি ছাড়াই একের পর এক ঋণ অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে ঋণের নামে অর্থ লুটের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গ্রুপটি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলো থেকে নামে-বেনামে মোট ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে ৪৩টি সরাসরি প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া হয়েছে ৯০ হাজার কোটি টাকা। বেনামি বা কাল্পনিক (শেল) কোম্পানির নামে নেওয়া হয়েছে ৯৮ হাজার কোটি টাকা। আর বাকি ৩৭ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে অন্যান্য বিভিন্ন মাধ্যমে। এই বিপুল ঋণের বিপরীতে রাখা জামানতের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত নগণ্য। ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে গ্রুপটির রাখা বন্ধকি সম্পদের বাজারমূল্য ছিল মাত্র ৩২ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি মূল্যায়নের চরম ব্যর্থতা নির্দেশ করে।
ব্যাংক থেকে লুট করা এই বিপুল অর্থ অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়ায় বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অর্থ স্থানান্তরের জন্য তারা মূলত বিভিন্ন ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম ব্যবহার করেছে। পাচার করা এই অর্থ দিয়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সাইপ্রাস ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) বিশাল সাম্রাজ্য ও সম্পদ গড়ে তুলেছে গ্রুপটি। এছাড়া শিথিল আর্থিক তদারকির অফশোর অঞ্চলগুলোর সঙ্গেও তাদের শক্তিশালী যোগাযোগ ছিল।
বিএফআইইউ আরও জানিয়েছে, এস আলম গ্রুপের মূল ব্যক্তিরা তিনটি ভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন, যা পাচার করা অর্থ আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত আনার কাজকে আরও জটিল করে তুলেছে। তাদের বিদেশি উদ্যোগগুলো মূলত প্রবাসী আয় সেবা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও হুন্ডির আড়ালে অবৈধ অর্থ পাচারের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে কাজ করেছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেয়ে গত শনিবার প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এস আলম গ্রুপের কাছে ই-মেইলে যোগাযোগ করা হলেও গত মঙ্গলবার পর্যন্ত তাদের কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ


























