২০২৪ সালের ২২ জুলাই দিনটি ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তাল পরিস্থিতির চরম পর্যায়। ওই দিন দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক অভিযান, কারফিউ এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকার মতো ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক অস্থিরতার এই দিনটিতে বিএনপি ও জামায়াতের প্রায় ১ হাজার ২০০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অভিযোগ করেন যে, বিএনপি-জামায়াত কোটা সংস্কার আন্দোলনের আড়ালে সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে। এ সময় তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘শেখ হাসিনা পালায় না।’ অন্যদিকে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেন, আন্দোলনের শুরুতেই আলোচনার সুযোগ ছিল, কিন্তু সরকারের কঠোর দমন-পীড়নের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় দুই হাজার ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ জুলাই রাত থেকে ২২ জুলাই সকাল পর্যন্ত শুধুমাত্র ঢাকা থেকেই ৫১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এ পর্যন্ত ১৬৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযান চলাকালে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, বগুড়া, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া র্যাব পৃথক অভিযানে আরও কয়েক ডজন ব্যক্তিকে আটক করে।
২২ জুলাই গভীর রাতে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভাঙচুর ও তল্লাশির অভিযোগ ওঠে। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বাসভবনেও অভিযান চালানো হয়। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীমকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন আদালত।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কোটা সংস্কারসংক্রান্ত সারসংক্ষেপে এদিন স্বাক্ষর করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখা হয় এবং সাধারণ ছুটির মেয়াদ আরও একদিন বাড়ানো হয়। ১৯ জুলাই থেকে জারি থাকা কারফিউ বহাল থাকলেও দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তা শিথিল করা হয়েছিল। অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম চার দফা দাবি জানিয়ে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ঘোষণা করেন এবং ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি সাময়িক স্থগিত করেন।
রাজধানীজুড়ে সেদিন সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের কড়া নিরাপত্তা ছিল। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সাঁজোয়া যান মোতায়েন করা হয় এবং আকাশে হেলিকপ্টার টহল দেয়। একই দিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দুই আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়। এই ঘটনাপ্রবাহ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে, যার ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে চট্টগ্রামে ৪৬ জন, নারায়ণগঞ্জে ১১০, গাজীপুরে ১৫৬, বগুড়ায় ৯৪, কুমিল্লায় ৯১, রংপুর, টাঙ্গাইল, কক্সবাজার, বরিশাল, জামালপুর, লক্ষ্মীপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। র্যাবও পৃথক অভিযানে কয়েক ডজন ব্যক্তিকে আটক করে।
Leave a Reply