করসেবা সহজ, দ্রুত, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আজ থেকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের ২০২৬-২০২৭ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিলের সুবিধা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে। দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কর অফিসে সরাসরি গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার দিন পেছনে ফেলে দেশের করদাতারা এখন ডিজিটাল সিস্টেমের সুফল ভোগ করছেন। ২০২১ সালে এনবিআর প্রথম অনলাইন রিটার্ন দাখিল পদ্ধতি চালুর পর থেকেই এই সিস্টেমটি করদাতাদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। নিবন্ধিত করদাতারা বোর্ডের নির্ধারিত ওয়েবসাইটে গিয়ে কয়েক ক্লিকেই রিটার্ন জমার সুবিধা পাওয়ায় কর ব্যবস্থাপনায় অভাবনীয় গতি এসেছে। বিগত ২০২৫-২০২৬ করবর্ষে রেকর্ড প্রায় ৪৭ লাখ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা ই-রিটার্ন সিস্টেমের মাধ্যমে সফলভাবে তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছিলেন।
আয়কর ব্যবস্থাকে শতভাগ ডিজিটালাইজড করার কৌশলগত অংশ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এক বিশেষ আদেশ জারির মাধ্যমে সব স্বাভাবিক ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র ব্যতীত আর কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা সনাতনী বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কাগজপত্রে রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন না। এনবিআরের নীতিনির্ধারকদের মতে, বাধ্যতামূলক ই-রিটার্ন চালুর ফলে কর ফাঁকি যেমন কমবে, তেমনি সরকারের রাজস্ব আহরণের গতিও বহুগুণ বাড়বে।
তবে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কিছু সংবেদনশীল ও বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে বিধিমোতাবেক ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের প্রবীণ করদাতা, উপযুক্ত সনদপত্র দাখিল সাপেক্ষে শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা, বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি করদাতা, মৃত করদাতার পক্ষে আইনগত প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকগণ অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করার পরিবর্তে পূর্বের ন্যায় সনাতন পদ্ধতিতে পেপার রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। এছাড়া কারিগরি বা বায়োমেট্রিক সংক্রান্ত সমস্যার কারণে যদি কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তিশ্রেণি করদাতা ই-রিটার্ন সিস্টেমে নিবন্ধন করতে ব্যর্থ হন, তবে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অতিরিক্ত অথবা যুগ্মকর কমিশনারের লিখিত পূর্বানুমোদনক্রমে তারা ম্যানুয়ালি পেপার রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।
অনলাইন রিটার্ন ব্যবস্থার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে এবং তাৎক্ষণিক সনদ প্রাপ্তির সুবিধা। এনবিআরের ওয়েব সিস্টেমে করদাতাগণ ব্যাংক ট্রান্সফার, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ডের পাশাপাশি বিকাশ, রকেট, নগদ কিংবা অন্য কোনো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ঘরে বসেই তাঁদের প্রদেয় আয়কর পরিশোধ করতে পারবেন। সঠিক তথ্য প্রদান করে নির্ভুলভাবে রিটার্ন প্রস্তুত ও দাখিল করার সাথে সাথেই সিস্টেম থেকে অটোমেটেড উপায়ে তাৎক্ষণিক প্রাপ্তিস্বীকারপত্র ও আয়কর সনদ সংগ্রহ করার সুযোগ রয়েছে।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করার ক্ষেত্রে যেকোনো প্রকার কারিগরি বা পদ্ধতিগত সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে রাজস্ব বোর্ড। সরকারি ছুটি ব্যতীত অফিস চলাকালীন সময়ে সার্বক্ষণিক সেবা প্রদানের জন্য একটি শক্তিশালী কল সেন্টার (০৯৬৪৩৭১৭১৭১) চালু রাখা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমের মাধ্যমেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা সরাসরি প্রযুক্তিগত ও আইনি পরামর্শ প্রদান করছেন।
করদাতাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করতে চলতি ২০২৬-২০২৭ করবর্ষে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাগণ বছরের শুরু অর্থাৎ জুলাই হতে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে অনলাইন রিটার্ন দাখিল করলে প্রদেয় নিট করের ওপর ৫ শতাংশ (সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত) বিশেষ প্রণোদনা বা ছাড় প্রাপ্ত হবেন। তবে এনবিআর সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, নির্ধারিত সেপ্টেম্বর মাসের পর দাখিলকৃত রিটার্নের ক্ষেত্রে এই বিশেষ প্রণোদনা সুবিধা কার্যকর থাকবে না। অধিকন্তু, ডিসেম্বর মাসের পর বা সময়সীমা বাড়ানোর পর দাখিলকৃত রিটার্নে আইনি ধারা অনুযায়ী অতিরিক্ত বিলম্ব কর প্রদেয় হবে।
ঢাকা ট্যাক্সসেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সদস্য ও অভিজ্ঞ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, সাধারণ করদাতাদের জন্য অনলাইন ই-রিটার্ন অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যময় ও আধুনিক ব্যবস্থা হলেও এনবিআরকে এর সার্ভার ক্যাপাসিটি আরও উন্নত রাখতে হবে যাতে শেষ দিনগুলোতে করদাতারা গতি সংক্রান্ত সমস্যায় না পড়েন। সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট কর আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রীম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য অ্যাডভোকেট এস. এম. রেজাউল করিম এনবিআরের পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়ে মন্তব্য করেন, অনলাইনে রিটার্ন প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করা দুর্নীতি ও হয়রানি কমাতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে, বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য ৫ শতাংশ কর প্রণোদনার আইনি সুযোগটি সময়মত কর আয়ে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলবে। তরুণ কর আইনজীবী বারিস্টার আহমেদ তানভীর জানান, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও এনআইডি ডাটাবেজের সাথে এনবিআরের অটোমেটেড সিঙ্ক নিশ্চিত করা গেলে কর ফাঁকি শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে এবং প্রবীণ ও শারীরিকভাবে অসমর্থ ব্যক্তিদের ম্যানুয়াল রিটার্নের সুযোগ রাখাটাও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত মানবিক ও যৌক্তিক হয়েছে।
Leave a Reply