ঢাকা ০১:৩৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

শিক্ষক নীতিমালা: শৃঙ্খলার নামে বুদ্ধিবৃত্তিক দমন চলতে পারে না

মোখলেছুর রহমান
  • আপডেট সময় : ০১:৪৬:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ৭৯৯৩ বার পড়া হয়েছে

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ‍‍্যমিক শিক্ষা ভবন

(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

 

শিক্ষক নীতিমালা: শৃঙ্খলার নামে বুদ্ধিবৃত্তিক দমন চলতে পারে না

 

 

শিক্ষকদের পেশাগত শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার অজুহাতে প্রণীত নতুন নীতিমালা শিক্ষা সংস্কারের চেয়ে বেশি করে কর্তৃত্ববাদী মানসিকতারই প্রতিফলন। শিক্ষকতার পাশাপাশি ঠিকাদারি বা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা যুক্তিযুক্ত হতে পারে। কিন্তু একই নীতিমালায় সাংবাদিকতা ও আইন পেশাকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

    এই সিদ্ধান্ত কেবল শিক্ষক সমাজের ওপর বাড়তি নিয়ন্ত্রণ আরোপ নয়; এটি সরাসরি বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত। শিক্ষকরা কি কেবল পাঠ্যসূচির সীমারেখায় আবদ্ধ থাকবেন? সমাজের অন্যায়, অনিয়ম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার কি তাঁদের নেই? রাষ্ট্র যদি শিক্ষকদের কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চায়, তবে সেটি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য মারাত্মক বার্তা বহন করে।

 

 

নীতিমালাটি প্রকাশের পর শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তা স্পষ্ট করে দেয়—এই উদ্যোগ কোনো অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসেনি। একপক্ষ যেখানে এটিকে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে দেখছে, সেখানে বাস্তবতা হলো—এই নীতিমালা শিক্ষক সমাজে বৈষম্য, অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা বাড়াবে। শাসন দিয়ে শিক্ষা চলে না; শিক্ষা চলে আস্থা ও মর্যাদার ওপর।

 

এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব দেলাওয়ার হোসেন আজিজীর বক্তব্যে যথার্থভাবেই উদ্বেগ উঠে এসেছে। তাঁর মতে, সাংবাদিকতা ও আইন পেশাকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। যোগ্য শিক্ষকদের সাংবাদিকতার পথ বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্থানীয় গণমাধ্যম—যা ইতিমধ্যেই নানামুখী চাপে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

 

 

     শিক্ষকরা সমাজের বিবেক, মতামত নির্মাতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকনির্দেশক। তাঁদের কলম ও কণ্ঠকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা মানে প্রশ্নহীন সমাজ তৈরির পথে হাঁটা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, বিপজ্জনকও।

 

 

নীতিনির্ধারকদের স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে—শিক্ষার মানোন্নয়ন কোনো নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসে না। শৃঙ্খলার নামে পেশাগত স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার সংকুচিত করলে এই নীতিমালা শিক্ষার উন্নয়ন নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নতুন এক বোঝা হয়ে উঠবে।

 

 

অবিলম্বে নীতিমালার বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করে শিক্ষক সমাজের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। অন্যথায়, ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে—শিক্ষা সংস্কারের নামে নেওয়া এই সিদ্ধান্তই শিক্ষা সংকটকে আরও গভীর করেছে।

 

 

 

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

শিক্ষক নীতিমালা: শৃঙ্খলার নামে বুদ্ধিবৃত্তিক দমন চলতে পারে না

আপডেট সময় : ০১:৪৬:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫

 

 

শিক্ষক নীতিমালা: শৃঙ্খলার নামে বুদ্ধিবৃত্তিক দমন চলতে পারে না

 

 

শিক্ষকদের পেশাগত শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার অজুহাতে প্রণীত নতুন নীতিমালা শিক্ষা সংস্কারের চেয়ে বেশি করে কর্তৃত্ববাদী মানসিকতারই প্রতিফলন। শিক্ষকতার পাশাপাশি ঠিকাদারি বা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা যুক্তিযুক্ত হতে পারে। কিন্তু একই নীতিমালায় সাংবাদিকতা ও আইন পেশাকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

    এই সিদ্ধান্ত কেবল শিক্ষক সমাজের ওপর বাড়তি নিয়ন্ত্রণ আরোপ নয়; এটি সরাসরি বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত। শিক্ষকরা কি কেবল পাঠ্যসূচির সীমারেখায় আবদ্ধ থাকবেন? সমাজের অন্যায়, অনিয়ম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার কি তাঁদের নেই? রাষ্ট্র যদি শিক্ষকদের কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চায়, তবে সেটি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য মারাত্মক বার্তা বহন করে।

 

 

নীতিমালাটি প্রকাশের পর শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তা স্পষ্ট করে দেয়—এই উদ্যোগ কোনো অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসেনি। একপক্ষ যেখানে এটিকে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে দেখছে, সেখানে বাস্তবতা হলো—এই নীতিমালা শিক্ষক সমাজে বৈষম্য, অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা বাড়াবে। শাসন দিয়ে শিক্ষা চলে না; শিক্ষা চলে আস্থা ও মর্যাদার ওপর।

 

এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব দেলাওয়ার হোসেন আজিজীর বক্তব্যে যথার্থভাবেই উদ্বেগ উঠে এসেছে। তাঁর মতে, সাংবাদিকতা ও আইন পেশাকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। যোগ্য শিক্ষকদের সাংবাদিকতার পথ বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্থানীয় গণমাধ্যম—যা ইতিমধ্যেই নানামুখী চাপে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

 

 

     শিক্ষকরা সমাজের বিবেক, মতামত নির্মাতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকনির্দেশক। তাঁদের কলম ও কণ্ঠকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা মানে প্রশ্নহীন সমাজ তৈরির পথে হাঁটা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, বিপজ্জনকও।

 

 

নীতিনির্ধারকদের স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে—শিক্ষার মানোন্নয়ন কোনো নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসে না। শৃঙ্খলার নামে পেশাগত স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার সংকুচিত করলে এই নীতিমালা শিক্ষার উন্নয়ন নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নতুন এক বোঝা হয়ে উঠবে।

 

 

অবিলম্বে নীতিমালার বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করে শিক্ষক সমাজের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। অন্যথায়, ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে—শিক্ষা সংস্কারের নামে নেওয়া এই সিদ্ধান্তই শিক্ষা সংকটকে আরও গভীর করেছে।

 

 

 

Facebook Comments Box