মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত কাতার বর্তমানে তার কূটনৈতিক ও কৌশলগত মিত্রের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ইরান যুদ্ধের পর পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সমীকরণের প্রেক্ষাপটে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি বেইজিং সফর করেছেন। দুই দিনের এই সফর শেষে উভয় দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীন ও কাতারের সম্পর্ক এখন এক নতুন ‘সোনালি দশকে’ প্রবেশ করেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে কাতারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে চীন জ্বালানি, বিনিয়োগ ও উন্নত প্রযুক্তি খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার ফলে কাতার ও চীন উভয়েরই জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতার এবং অপরিশোধিত তেলের শীর্ষ আমদানিকারক চীন—উভয়েরই এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। জ্বালানি খাতই এই সম্পর্কের মূলভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। গত বছর দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩.৮ বিলিয়ন ডলার এবং কাতার বর্তমানে চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারী দেশ।
ইরান ইস্যুতে দুই দেশের স্বার্থ অভিন্ন হলেও সংকট মোকাবিলায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ভিন্নতা রয়েছে। চীন কাতারের মধ্যস্থতাকে সমর্থন করলেও ইরানের হামলার সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে গেছে এবং এর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করেছে। বেইজিং তেহরানের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার। অন্যদিকে, কাতার নিজ ভূখণ্ড ও প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলার ঘটনায় তেহরানের কড়া নিন্দা জানিয়েছে। দোহার মতে, বেইজিংয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ইরানকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার একটি নতুন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
কাতারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের সামরিক ও নিরাপত্তা অংশীদারত্বের বিষয়টি বেইজিংয়ের অজানা নয়। কাতারে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ‘আল উদেইদ’-এ গত মার্চে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর দোহা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প কোনো নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে আগ্রহী নয়; বরং বেইজিং নিজেকে একটি প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
কাতারের প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কেবল ইরান ইস্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত দিগন্তে নিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে। দোহা ও বেইজিং ঐতিহ্যবাহী ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অর্থায়ন খাতে সম্পর্ক গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে। ‘ইনভেস্ট কাতার’-এর তথ্যমতে, গত এক দশকে দেশটিতে ৫২০টি চীনা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে এবং ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে ৩ হাজার ২০০টির বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ইরান যুদ্ধ যখন দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতার পরীক্ষা নিচ্ছে, ঠিক তখনই এই সফরের মাধ্যমে তাদের সম্পর্ক অর্থনৈতিকভাবে আরও বিস্তৃত এবং কূটনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: মানবজমিন
Leave a Reply