দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে সরকার ও ডিলাররা দাবি করলেও, মাঠ পর্যায়ে এর চিত্র ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষকরা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না, আবার কোথাও কোথাও রেশনিং করে সার দেওয়া হচ্ছে। এই সংকট নিরসনে ব্যর্থ হয়ে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে অননুমোদিত বিক্রেতাদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর কৃষক আফজাল হোসেন জানান, ১৫ বিঘা জমিতে আমন চাষের জন্য ডিলারের কাছ থেকে মাত্র এক বস্তা ইউরিয়া পেয়েছেন। একই অবস্থা লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের কৃষক শামসুল আলমের।
তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় ডিলার সার লুকিয়ে রেখে কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রি করছেন। পরে প্রশাসন ও পুলিশ হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও সারের সরবরাহ এখনো চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর চা চাষি সামির উদ্দিন জানান, খোলাবাজার থেকে প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১,৫৮০ টাকা এবং ডিএপি ১,৪৫০ টাকায় কিনতে হয়েছে, যেখানে সরকারি নির্ধারিত দাম যথাক্রমে ১,৩৫০ ও ১,১০০ টাকা।
ডিলারদের দাবি, তাদের বরাদ্দের তুলনায় কৃষকদের চাহিদা কয়েক গুণ বেশি। রৌমারীর ডিলার সাইফুল ইসলাম জানান, চলতি মাসে ১,০০০ বস্তা ইউরিয়া বরাদ্দ পেয়েছেন যা পাঁচ ধাপে বিতরণের নির্দেশনা রয়েছে। প্রতিটি কৃষককে সর্বোচ্চ এক বস্তা করে দেওয়ার নিয়ম মেনেও তারা হিমশিম খাচ্ছেন। রাজশাহী জেলা সার ও কীটনাশক কমিটির সভাপতি ওসমান আলী অবশ্য তার এলাকায় কোনো সংকট নেই বলে দাবি করেছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে সারের চাহিদা ১৩.২১ লাখ টন, যার বিপরীতে মজুত রয়েছে ১২.৪৫ লাখ টন। এছাড়া ডিলারদের কাছে আরও ২ থেকে ২.৫ লাখ টন সার রয়েছে। কৃষি সচিব মো. সেলিম খান জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং অনিয়মের দায়ে তিন ডিলারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম ও আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, সারের সংকট হতে পারে—এমন আতঙ্কে কৃষকরা অতিরিক্ত সার কিনছেন বা মজুত করছেন। তবে কৃষকদের দাবি, তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কিনছেন না, বরং সরকারি বিতরণ ব্যবস্থায় ঘাটতির কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের জুন মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কৃষক নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফারের ভারসাম্যহীন ব্যবহার করেন। কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, এটি মূলত একটি ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা। সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকলে অনিয়ম ও দাম বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়।
তিনি সরকারকে নিশ্চিত করতে বলেছেন যেন বরাদ্দকৃত সার সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে রাসায়নিক সারের চাহিদা প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫৮ লাখ টন। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও আমদানি ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে দেশের বাজার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
Leave a Reply