দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের এক নাজুক চিত্র ফুটে উঠেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থায়। বর্তমানে দেশে ২৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলোর নিজস্ব কোনো স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করেই শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ এবং শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, এই ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৪টিই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকার সাত কলেজের জন্য ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ অনুমোদন পায়। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে শুরু হয়েছে।
স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকায় এসব বিশ্ববিদ্যালয় ভাড়া করা ভবন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কক্ষ বা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অস্থায়ী স্থাপনায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অনেক প্রতিষ্ঠান ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে; যেমন তাদের ভাড়া বাবদ খরচ হয় ভ্যাট ও কর বাদে প্রায় ৮ লাখ ২১ হাজার টাকা। অনেক ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এখনো ঝুলে আছে, অথচ শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ছয়টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।
এছাড়া কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে তিনটি—খুলনা কৃষি, হবিগঞ্জ কৃষি ও কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে চারটি—চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। বিশেষায়িত ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি (ইউএফটিবি)।
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সুবিপ্রবি) উদাহরণটি বেশ স্পষ্ট। ২০২০ সালের নভেম্বরে আইন পাস হওয়ার পর ২০২২ সালের জুনে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও স্থায়ী ক্যাম্পাসের দেখা মেলেনি। বর্তমানে শান্তিগঞ্জ বাজারের একটি মাদ্রাসার ভবনে চলছে পাঠদান। শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ক্লাস হওয়ায় এবং আবাসন সংকটের কারণে তারা চরম ভোগান্তিতে আছেন।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজির অবস্থাও একই। ২০১৬ সালে আইন পাস হওয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৯২৮ জন শিক্ষার্থী ও ৪১ জন শিক্ষক রয়েছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিশন ও মিশনের তুলনায় অর্জনের হার খুবই নগণ্য বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। এখানে একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনগুলো একে অপরের থেকে অনেক দূরে অবস্থিত, যা যাতায়াতেও বড় সমস্যা তৈরি করে।
ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ জানান, নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুমোদন তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগেই দেওয়া হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ছাড়া নিয়োগ ও ভর্তি কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, এসব তাড়াহুড়োর পেছনে নিয়োগ বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবের বড় ভূমিকা রয়েছে।
এমনকি নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও রয়েছে। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিজের ছেলে, মেয়ে, শ্যালক-শ্যালিকার ছেলে ও ভাতিজাকে নিয়োগ দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া মেহেরপুর, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও ও লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই ধরনের তাড়াহুড়ো দেখা গেছে।
বর্তমানে দেশে ৬০টি পাবলিক ও ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনসহ সরকারি-বেসরকারি সব মিলিয়ে ৪৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় যুক্ত। অথচ আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ৫০০-এর তালিকায় নেই।
সব মিলিয়ে কার্যক্রম চালু থাকা ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আট হাজারের কিছু বেশি। এছাড়া মেহেরপুর, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, লক্ষ্মীপুর ও নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম চালুর প্রক্রিয়া চলছে। গত ২৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক মো. নিয়োগ পেয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু প্রশাসনিক কাঠামো বা আইন পাস করাই যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীরা কোথায় পড়বেন, শিক্ষকেরা কীভাবে পাঠদান করবেন এবং গবেষণার পরিবেশ কেমন হবে—এসব নিশ্চিত না করে বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা উচ্চশিক্ষার জন্য শুভকর নয়।
Leave a Reply