সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা যখন চাপ বাড়াচ্ছে, তখন বাংলাদেশের বিষয়ে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন করছে ভারত। এক্ষেত্রে নয়াদিল্লি পারস্পরিক স্বার্থের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বোঝাতে প্রথমবারের মতো ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রেসিপ্রোসিটি’ বা পারস্পরিকতার কথা উল্লেখ করেছে। ভারতের অনলাইন পোর্টাল দ্য প্রিন্টের এক প্রতিবেদনে কেশব পদ্মনাভন জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নিয়মিত ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিকতার ভিত্তিতে একটি ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
তিনি আরও বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন নিয়ে ভারতের অবস্থান নতুন করে ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই এবং প্রত্যর্পণের বিষয়টি প্রচলিত ও নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ভারতের ব্যবহৃত এই ভাষা ঢাকার সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক অবস্থানে একটি স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত এই প্রথমবার ‘রেসিপ্রোসিটি’ শব্দটি ব্যবহার করল, যখন বাংলাদেশ নিজেই জোর দিয়ে বলছে যে, দুই দেশের সম্পর্ক হতে হবে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক এখন একটি উত্তেজনাপূর্ণ ও সংকটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। দ্য প্রিন্ট মঙ্গলবার জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অদূর ভবিষ্যতে ভারত সফরের কোনো পরিকল্পনা নেই।
আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনেও তিনি যোগ দেওয়া এড়িয়ে যেতে পারেন, যদিও ভারত তাকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার মনে করছে, সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ভারতের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ রাজনৈতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম যে বিবৃতি দিয়েছেন, তাতে বলা হয়েছে- তারেক রহমান ভারত সফরে যাওয়ার আগে শেখ হাসিনা ও অন্যান্য অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণসহ কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে।
ঢাকায় আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ভারত ধারাবাহিকভাবে বলে এসেছে যে তারা সম্পর্ক ‘আরও শক্তিশালী’ করতে আগ্রহী। কিন্তু মঙ্গলবার ভারতের বক্তব্যে যে অতিরিক্ত ও কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে- বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বক্তব্যের পর ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নয়াদিল্লির দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণই নয়, রাজনৈতিক কর্মী ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত খুনিদেরও প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে। এসব দাবির ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে এবং কূটনৈতিক সমঝোতার সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে।
শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে সংবাদ সম্মেলনের পর গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে। হাসিনা আগস্ট ২০২৪ সালে ঢাকা ছেড়ে নয়াদিল্লিতে যান এবং তখন থেকে ভারতেই অবস্থান করছেন। ভারত অবশ্য হাসিনার সংবাদ সম্মেলন থেকে দ্রুত নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়।
চলতি মাসের শুরুতে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বলেন, এটি হাসিনার ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান। কিন্তু এতে ঢাকার ক্ষোভ কমেনি; বরং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে তার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়গুলোকে সরাসরি যুক্ত করছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রোববার ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে নতুন অবস্থান প্রকাশ করেছে, তার পর দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতি এখন মূলত রাজনৈতিক পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।
গত নয় মাসে ভারত একাধিক উচ্চপর্যায়ের সফর ও বৈঠকের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার আগ্রহ দেখানোর চেষ্টা করেছে।
গত বছরের শেষ দিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন। ফেব্রুয়ারিতে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
এপ্রিল মাসে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে জয়শঙ্করের বৈঠক হয়। গত মাসে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামসুল ইসলাম (অব.) নয়াদিল্লিতে বিমসটেক-এর জাতীয় নিরাপত্তা প্রধানদের বৈঠকে অংশ নেন।
গত সপ্তাহে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন ঢাকায় এসে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে সম্ভাব্য বৈঠকের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। পাশাপাশি আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনেও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে- বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তার ভূমিকাকে বিবেচনা করে। মা//জ//ন
Leave a Reply