ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতি ও নিট (এনইইটি) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে গত এক মাস ধরে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের এই দাবির সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন বিরোধীরাও, যার ফলে উত্তাল হয়ে উঠেছে সংসদ। তবে এত চাপের মুখেও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত বা পদত্যাগ করানোর কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার। কেন এই সমঝোতায় রাজি নয় সরকার এবং ধর্মেন্দ্র প্রধানের এমন কী রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে যার কারণে তিনি এতটা অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে।
নরেন্দ্র মোদি সরকারের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কোনো ধরনের চাপের কাছে মাথা নত না করা। গত ১২ বছরের শাসনামলে মোদি সরকারকে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছিল ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে পাস হওয়া তিনটি কৃষি আইন। দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন ও দিল্লির সীমান্ত দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকার পর ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেই আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। এই একটি মাত্র ঘটনা ছাড়া সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল, সিএএ, এনআরসি কিংবা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন—কোনো সিদ্ধান্ত থেকেই সরকার কখনো পিছিয়ে আসেনি।
সরকারের এই অনমনীয় মনোভাবের বিষয়টি ২০১৫ সালেই স্পষ্ট করেছিলেন তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। ললিত মোদি বিতর্কের সময়ে তিনি বলেছিলেন, এটি এনডিএ সরকার, ইউপিএ সরকার নয়; এখানে বিরোধীরা দাবি করলেই কাউকে পদত্যাগ করানো হয় না। এই নীতি মেনেই বড় ধরনের রেল দুর্ঘটনার পরও রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণোকে পদত্যাগ করানো যায়নি, কিংবা এপস্টিন ফাইলে নাম আসার পরও বাদ দেওয়া হয়নি হরদীপ সিং পুরিকে। মন্ত্রিসভায় যেকোনো রদবদল বিজেপি তার নিজের শর্তে ও উপযুক্ত সময়ে করে থাকে, বিরোধীদের চাপে নয়। ফলে এখন ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে দিলে তা হবে মোদি সরকারের এই চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং এতে নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ পাবে বলে মনে করেন মোদি।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের এই টিকে থাকার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো ওডিশার এই রাজনীতিকের সঙ্গে মোদি ও অমিত শাহর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তিনি কেবল শিক্ষামন্ত্রীই নন, বরং কয়েক বছর ধরে মোদি-শাহ জুটির নির্বাচনী কৌশল বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান কারিগর। ওডিশায় দীর্ঘ আড়াই দশকের বিজু জনতা দলের (বিজেডি) একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি যে জয় পেয়েছে, তার নেপথ্যে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সামনে রেখেই ঘুঁটি সাজানো হয়েছিল। ওডিশার পাশাপাশি বিহার, হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশেও তিনি বিজেপির অন্যতম বিশ্বস্ত ভোট-কুশলী হিসেবে কাজ করেছেন। তাই তাঁকে অপসারণ করার অর্থ হবে এক অত্যন্ত বিশ্বস্ত অনুসারীকে শাস্তি দেওয়া, যা মোদি-শাহ করতে চান না।
তৃতীয়ত, ধর্মেন্দ্র প্রধানকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ হবে সরকারের নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়া। নিট পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ কেবল একটি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে নয়, এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষা নীতি (এনইটি) এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। যখনই প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে, সরকার পরীক্ষা বাতিল করেছে এবং সিবিআই বা বিশেষ দল দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু কখনো শিক্ষামন্ত্রীকে দায়ী করেনি। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করলে প্রকারান্তরে এই পুরো ব্যবস্থার রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও দুর্বলতাই প্রকাশ পাবে, যা সরকার এড়াতে চায়।
চতুর্থ কারণটি হলো ভারতের জাতভিত্তিক সামাজিক সমীকরণ বা ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’। ধর্মেন্দ্র প্রধান হলেন পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান অনগ্রসর (ওবিসি) নেতা। ওডিশা ও বিহারে বিজেপির ভিত শক্ত করতে অনগ্রসর ও অতি অনগ্রসর শ্রেণির ভোটারদের মধ্যে তাঁর প্রভাব অনস্বীকার্য। ব্রাহ্মণবাদী তকমা ঘুচিয়ে বিজেপির পরিধি দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে অনগ্রসর যেসব নেতার অবদান রয়েছে, ধর্মেন্দ্র তাঁদের অন্যতম। তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলে অনগ্রসর সমাজ ক্ষুব্ধ হতে পারে এবং পূর্বাঞ্চলে বিজেপির জনপ্রিয়তা ও সামাজিক মেরুকরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা মোদি কোনোভাবেই চান না।
সর্বোপরি, নরেন্দ্র মোদির বিজেপি মনে করে যে মন্ত্রিসভায় কে থাকবেন আর কে বাদ যাবেন, তা সম্পূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত। বিরোধীরা বা আন্দোলনকারীরা সরকারকে এ ব্যাপারে বাধ্য করতে পারে না। শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে দিলে এই বার্তা যাবে যে লাগাতার আন্দোলন ও বিরোধীদের চাপে সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তবে কৃষকদের আন্দোলনের মতো শিক্ষার্থীরাও যদি দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন চালিয়ে যান এবং বিরোধীদের জোটবদ্ধতা আরও জোরালো হয়, তবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তা দেখার বিষয়। আপাতত শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণের দাবিতে বিরোধীরা অনড় এবং সংসদ অচল থাকলেও মোদি সরকার ধর্মেন্দ্র প্রধানের পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।
Leave a Reply