দেশের বিদ্যমান জনপ্রশাসনের কাঠামো ভেঙে প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি সব ধরনের বৈষম্য কমাতে প্রতিবেদন তৈরি করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন।
ঢাকা মহানগরী, টঙ্গী, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ নিয়ে রাজধানী মহানগর সরকার (ক্যাপিটাল সিটি গভর্নমেন্ট) গঠনের সুপারিশ করেছে এ কমিশন।
এক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ ভারতের নয়াদিল্লির মডেল অনুসরণ করেছে মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিশন। দেশের সবচেয়ে পুরোনো চারটি বিভাগকে চারটি প্রদেশে রূপান্তরের সুপারিশও এসেছে।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয় ৪৩টি থেকে কমিয়ে ২৫টি এবং অধিদপ্তর কমিয়ে ৪৪টি করার সুপারিশ করা হয়েছে।
গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার হাতে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন তুলে দেন মুয়ীদ চৌধুরী। পরে দুপুর ২টায় সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদটির নাম পরিবর্তন করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা কমিশনার নামের প্রস্তাব করা হয়েছে। আর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পদবি ঠিক করা হয়েছে উপজেলা কমিশনার।
প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয়গুলোকে পাঁচটি গুচ্ছে বিভক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। যেমন, বিধিবদ্ধ প্রশাসন; অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য; ভৌত অবকাঠামো ও যোগাযোগ; কৃষি ও পরিবেশ এবং মানব সম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন। মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে সচিবালয়ের উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত পদগুলো নিয়ে একটি সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস গঠনের সুপারিশ করেছে মুয়ীদ চৌধুরীর কমিশন।
কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য ও সরকারের খরচ কমাতে উপসচিব থেকে ওপরের স্তরের কর্মকর্তাদের জন্য সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনার সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
উপসচিব পদে পদোন্নতিতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য ৫০ শতাংশ এবং অন্য ক্যাডারের জন্য ৫০ শতাংশ কোটার সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) আওতায় একীভূত ক্যাডার সার্ভিস বাতিল করে ১৩টি প্রধান সার্ভিসে বিভক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
একজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি অতিরিক্ত সচিবদের মধ্য থেকে বাছাই করে সচিব ও সচিবদের মধ্য থেকে মুখ্য সচিব পদে পদোন্নতির প্রস্তাব সরকারপ্রধানের কাছে পেশ করবে। বর্তমান সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড বাতিল করা যেতে পারে বলে মনে করে কমিশন। অতিরিক্ত সচিবদের মধ্য থেকে সচিব নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনাময় কর্মকর্তাদের জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো তারা যোগ্য হতে পারে।
এ ছাড়া সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিসের বাইরে ৫ শতাংশ পদে সরকার বিশেষ কোনো যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক যুগ্ম সচিব বা সংস্থাপ্রধান পদে নিয়োগ দিতে পারে। এক্ষেত্রে পিএসপি থেকে বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে।
মন্ত্রণালয়গুলোকে পুনর্বিন্যস্ত করা হলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে একাধিক বিভাগ সৃষ্টি হবে। তাদের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য সেসব মন্ত্রণালয়ে কর্মরত একজন সচিবকে মুখ্য সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমান সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে এ পদে পদায়ন করা যেতে পারে। বর্তমান সিনিয়র সচিব নামকরণ বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও সচিব পদে কোনো বেতন গ্রেড বা স্কেল থাকবে না। সরকার তাদের বেতন-ভাতা ও সুবিধাদি নির্ধারণ করবে।
সুপারিশ অনুযায়ী, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি হবে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে। প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হবে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রিলির ফল। জুনের দ্বিতীয়ার্ধে (১০ দিন) লিখিত পরীক্ষা হবে। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ফল। মৌখিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা হতে হবে পরবর্তী বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে চূড়ান্ত ফল। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুলিশ ছাড়পত্র। নিয়োগের আদেশ গেজেট জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে এবং নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে যোগদান হবে জুলাইয়ের ১ তারিখ। পিএটিসির ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ে যোগদানের সুযোগ দিতে হবে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে।
শূন্য পদ ছাড়া পদোন্নতি না দেওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদন বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে লক্ষ্য করা গেছে যে, শূন্য পদের চেয়ে অধিক সংখ্যক পদে পদোন্নতি দিয়ে জটিলতার সৃষ্টি করা হয়। এরূপ প্রবণতা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। কেবল শূন্য পদের বিপরীতে সমসংখ্যক পদে পদোন্নতি দেওয়ার বিধান করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
সরকারি কর্মচারীদের স্থায়ী বেতন কমিশন গঠন করে তার মাধ্যমে প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি কর্মচারীরা ১৫ বছর চাকরি করার পর স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়লে তাদের পেনশনসহ সব ধরনের অবসর সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাধ্যতামূলক অবসর বা ওএসডিতে পাঠানোর বিধান বাতিলের প্রস্তাব করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন।
সহকারী একান্ত সচিবের (এপিএস) মতো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদেরও পছন্দমতো সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরে থেকে একান্ত সচিব (পিএস) নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতীতে দেখা গেছে, সিভিল সার্ভিসের অনেক অফিসার মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পিএস বা এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনের কারণে পরবর্তী সরকারের আমলে হয়রানির শিকার বা পদোন্নতি বঞ্চিত বা ওএসডি হয়েছেন। এরূপ পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পিএস ও এপিএস মন্ত্রীদের অভিপ্রায় অনুসারে সিভিল সার্ভিসের বাইরে থেকে নিয়োগ করা যেতে পারে।
নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের সব মন্ত্রণালয়ে নারী মর্যাদা রক্ষা অফিসার নিয়োগের সুপারিশ এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগে একজন করে নারী অফিসারকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে তার নিজ মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এবং অধীনস্ত অধিদপ্তর ও মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোয় কর্মজীবী নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির কাজ করার নির্দেশনা দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হলো।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কখনোই নাগরিকদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হননি। কিছু জেলা পরিষদ বাদে অধিকাংশেরই নিজস্ব রাজস্বের শক্তিশালী উৎস নেই। ফলে অধিকাংশ জেলা পরিষদ আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। সেহেতু জেলা পরিষদ বাতিল করা যেতে পারে। জেলা পরিষদের সম্পদ প্রস্তাবিত সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক সরকারকে হস্তান্তর করা যেতে পারে।
পৌরসভা সম্পর্কে বলা হয়েছে, গুরুত্ব বিবেচনায় স্থানীয় সরকার হিসেবে একে অধিকতর শক্তিশালী করার জন্য সুপারিশ করা হলো। পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন ওয়ার্ড মেম্বারদের ভোটে। কারণ চেয়ারম্যান একবার নির্বাচিত হলে মেম্বারদের আর গুরুত্ব দেয় না। স্থানীয় সরকার হিসেবে উপজেলা পরিষদকে আরও শক্তিশালী করার জন্য সুপারিশ করা হলো। তবে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদটি বাতিল করা যেতে পারে। উপজেলা পরিষদকে আরও জনপ্রতিনিধিত্বশীল করতে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের এক-তৃতীয়াংশকে আবর্তন পদ্ধতিতে পরিষদের সদস্য হওয়ার বিধান করা যেতে পারে।
ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সংখ্যা জনসংখ্যার অনুপাতে ৯ থেকে ১১ করা যেতে পারে। প্রতিটি ওয়ার্ডে দুজন সদস্য নির্বাচিত হবেন, যাদের মধ্যে মেয়াদি একজন অবশ্যই নারী হতে হবে বলে বিধান করার সুপারিশ করা হলো। এর ফলে একদিকে নারীদের ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব এবং তাদের কর্ম এলাকা সুনিশ্চিত হবে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন মেম্বারদের ভোটে। কারণ চেয়ারম্যান একবার নির্বাচিত হলে মেম্বারদের আর গুরুত্ব দেন না।
অপরাধীকে ক্ষমা প্রদর্শনে রাষ্ট্রপতি ও নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করেছে বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশন। তাদের সুপারিশে বলা হয়েছে, ক্ষমা প্রদর্শন আইন নামে একটি আইন প্রণয়ন করা হবে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতাসহ অন্যান্য সব নির্বাহী ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা এই আইনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হবে। ক্ষমা প্রদর্শন আইনের মাধ্যমে একটি ক্ষমা প্রদর্শন বোর্ড গঠিত হবে।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের এই বোর্ডে ক্ষমা প্রদানের জন্য গৃহীত সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি বা সংশ্লিষ্ট নির্বাহী বিভাগ ক্ষমা প্রদর্শন করবে। তবে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিসে আইন কর্মকর্তা নিয়োগ কীভাবে হবে এবং এই সার্ভিস থেকে হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ কীভাবে হবে, সে বিষয়ে কমিশনের তিনজন সদস্য দ্বিমত পোষণ করেছেন। পাশপাশি তারা অধস্তন আদালতের বিচারকদের মধ্য থেকে হাইকোর্ট বিভাগে ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগের সুপারিশ করেছেন। তাদের সুপারিশও কমিশনের প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে। তবে ভিন্নমতের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামত প্রাধান্য পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গতকাল বুধবার কমিশনের প্রধান আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানের নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করে।
বিচার বিভাগের প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রস্তাব করতে গত ৩ অক্টোবর আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমানের নেতৃত্বে আট সদস্যের সংস্কার কমিশন গঠন করে সরকার। এরপর থেকেই কমিশন সরেজমিন বিভিন্ন আদালত পরিদর্শন, মতবিনিময়সহ নানা কার্যক্রম গ্রহণ করে। দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর বিচার বিভাগের মোট ৩০টি বিষয়ে সংস্কারের প্রস্তাব করে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে কমিশন।
প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ ও শৃঙ্খলা, অধস্তন আদালতে বিচারক নিয়োগ ও চাকরির শর্তাবলি, সুপ্রিম কোর্টে আলাদা সচিবালয় স্থাপন, আদালত ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা, স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সংস্থা গঠন, বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি লাঘব, দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, আইনগত সহায়তা কার্যক্রম ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকর করা, প্রচলিত আইনের, আইন পেশার ও আইন শিক্ষার সংস্কার, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রতিরোধ, মামলার জট হ্রাস, মোবাইল কোর্টে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সাজা প্রদানের ক্ষমতা রহিত করা, গ্রাম আদালতের ভুল-ত্রুটি দূর করা, বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করাসহ মোট ৩০টি বিষয়ে সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার তানিম হোসেইন শাওন কালবেলাকে বলেন, কমিশন ৩০টি বিষয়ে আলোকপাত করেছে। একটি সারসংক্ষেপও জমা দেওয়া হয়েছে। এখন জাতীয় ঐক্য কমিশন এই সুপারিশগুলো নিয়ে কাজ করবে। বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে বিচারপতি এমদাদুল হক ঐক্য কমিশনের সঙ্গে কাজ করবে। সুপারিশের মধ্যে কোনগুলো স্বল্পমেয়াদি ও কোনগুলো দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নযোগ্য, তা বিশ্লেষণ করবে। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এসব নিয়ে বৈঠক হবে।
বর্তমানে দণ্ড মার্জনা, দণ্ড মওকুফ, দণ্ড হ্রাস, দণ্ড স্থগিত এবং দণ্ড বিলম্বের বিষয়গুলো সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ এবং ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১, ৪০২ ও ৪০২ক ধারা অনুসারে পরিচালিত হয়। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত কোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্ব ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যে কোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক এই শাস্তি হ্রাস বা ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষমতা ব্যবহারের কিছু নিয়মনীতি লিখিত ও অলিখিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব নিয়মনীতির পেছনে বিভিন্ন দেশের উচ্চ আদালতেরও ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতার অপব্যবহার করছে, তা সর্বজনবিদিত উল্লেখ করে তা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন ও বোর্ড গঠনের কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
আবেদন যাচাই-বাছাই করে অ্যাটর্নি জেনারেল ক্ষমা প্রদর্শন বোর্ডের সভা আহ্বান করবেন। ক্ষমাপ্রাপ্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণে বোর্ড একমত না হতে পারলে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। গৃহীত সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতি বা সংশ্লিষ্ট নির্বাহী দপ্তরকে অবহিত করা হবে। বোর্ডে গৃহীত সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি বা সংশ্লিষ্ট নির্বাহী বিভাগ ক্ষমা প্রদর্শন করবে। এ ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা ও ধরন, অপরাধীর আচরণ বিবেচনাসহ ১০ বিষয় অনুসরণেরও সুপারিশ করেছে কমিশন।
স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিসের নিয়োগ, এই সার্ভিস থেকে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক নিয়োগের সুযোগ রাখা এবং সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিচার-কর্মবিভাগে (অধস্তন আদালতে) নিয়োজিত জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের নিয়োগের ব্যাপারে কমিশনের তিনজন সদস্য ভিন্নমত পোষণ করেছেন। ভিন্নমত পোষণকারী তিনজন হলেন বিচারপতি ফরিদ আহমদ শিবলী, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মাসদার হোসেন এবং সাবেক জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম।
ভিন্নমত পোষণকারী তিনজন মতামতে বলেছেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
প্রস্তাবিত অ্যাটর্নি সার্ভিসে নিয়োগকৃত সদস্যদের যোগ্যতা, কাজের মান ও দক্ষতাসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিরীক্ষণ ও মূল্যায়ন না করে ওই সার্ভিসের সদস্যদের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক হিসেবে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এ মুহূর্তে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান সংশোধনের যে কোনো ধরনের প্রস্তাব প্রেরণ করা সমীচীন হবে না।
এ ছাড়া সরকারি কর্ম কমিশনের পরিবর্তে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত অ্যাটর্নি সার্ভিসের সদস্য নিয়োগ এবং এর কার্যপরিধি বাড়িয়ে লিগ্যাল অ্যান্ড বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন নামকরণ কোনো অবস্থাতেই বাস্তবসম্মত নয়। সর্বোপরি এরূপ উদ্যোগ মাসদার হোসেন মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনার পরিপন্থি।
তাদের দেওয়া সুপারিশে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিস অধ্যাদেশ, ২০০৮ নামে যে অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি হয়েছিল, সেটির কাঠামো ও নিয়োগ বিধান অনুসরণ করে অ্যাটর্নি সার্ভিসের নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। প্রস্তাবিত অ্যাটর্নি সার্ভিসে নিয়োগকৃত সদস্যদের যোগ্যতা, কাজের মান ও দক্ষতাসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিরীক্ষণ ও মূল্যায়ন না করে ওই সার্ভিসের সদস্যদের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক হিসেবে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এ মুহূর্তে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন তথা বাংলাদেশ সংবিধান সংশোধনের কোনো ধরনের প্রস্তাব প্রেরণ করা সমীচীন হবে না।
সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত অ্যাটর্নি সার্ভিসে নিয়োগ প্রদান করতে হবে। হাইকোর্ট বিভাগে অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে অ্যাডভোকেট এবং বিচার-কর্মবিভাগের সদস্যদের অনুপাত ৫০:৫০ নির্ধারণ করতে হবে।
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে কর্মরত বিচার-কর্মবিভাগের ন্যূনতম একজন সদস্যকে সর্বদা আপিল বিভাগে নিয়োগের বিধান প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে সন্নিবেশিত করতে হবে। পৃথক অ্যাটর্নি সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা যেন জেলা পর্যায়ে বিচারকদের সমান বা বেশি না হয় বা ওই সার্ভিসের মাধ্যমে বিচারকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়, সেই বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে।
Leave a Reply