মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে এক কঠোর কৌশলের ঘোষণা দিয়েছেন। বুধবার ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে তিনি জানান, ইরানের বিরুদ্ধে “যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে নেয়া সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক অভিযান” শুরু করা হবে। ইরানকে বোমা হামলার মাধ্যমে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে ব্যর্থ হওয়া এবং পারমাণবিক আলোচনায় ফেরাতে না পারার পর ট্রাম্পের এই নতুন পদক্ষেপকে অনেকে তার রাজনৈতিক মুখরক্ষার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
ট্রাম্প এখন ইরানের সঙ্গে সব ধরনের আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার প্রশাসন রাজনৈতিক মিত্রদের জানিয়েছে যে প্রেসিডেন্ট এখন দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ক্ষয়যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছেন।
ট্রাম্পের বিশ্বাস, এই চাপের মুখে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত দেশটির সরকার আত্মসমর্পণে বাধ্য হবে। বুধবার যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প সন্তোষ প্রকাশ করলেও, বাস্তবে এই সংঘাত এখন ষষ্ঠ মাসে গড়িয়েছে।
নতুন এই কৌশলের অংশ হিসেবে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যেসব দেশ ইরানকে আর্থিক সহায়তা বা বেঁচে থাকার সুযোগ দেবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর মধ্যে তেল পাচার, অর্থ স্থানান্তর, মানি এক্সচেঞ্জ, জাহাজ নিবন্ধন এবং ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে সহায়তা বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে অনেক বিশ্লেষকই ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান। ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা এবং গবেষণা ও বিশ্লেষণ বিভাগের ইরান শাখার প্রধান ড্যানিয়েল সিত্রিনোভিচ বলেন, যারা মনে করেন অর্থনৈতিক চাপে ইরান ভেঙে পড়বে, তারা ভুল করছেন। মঙ্গলবার সিএনএন ইন্টারন্যাশনালকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হলেও ইরান তার কৌশল পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “শেষ পর্যন্ত এই চাপের কারণে ইরানের হিসাব-নিকাশ বদলে যাবে বলে আমি মনে করি না।”
ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হলে শুধু তেহরানের হিসাব বদলালেই হবে না, ট্রাম্পকেও নিজের আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস করতে কয়েক মাস বা বছর লেগে যেতে পারে, যার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ধৈর্য। ইরান যদি বুঝতে পারে যে ট্রাম্প দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, তবে তেহরানের পক্ষে সেই ঝুঁকি নেয়া অস্বাভাবিক নয়।
হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো লুডোভিক হুড মনে করেন, ইরানের ওপর বাস্তব চাপ তৈরির জন্য ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) আয়ের উৎস এবং তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি বাগদাদ ও বৈরুতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইরানের তেল কেনার অন্যতম বড় দেশ চীনের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তবে চীনের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সামনে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে আসার কথা রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের আগে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার মতো কোনো কঠোর পদক্ষেপ ট্রাম্প নেবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানও পাল্টা চাল চালার সুযোগ খুঁজছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাস বাকি থাকায় ট্রাম্প এখন রাজনৈতিকভাবে বেশ স্পর্শকাতর অবস্থানে রয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮০ সালের জিমি কার্টারের জিম্মি সংকটের মতো ট্রাম্পকেও রাজনৈতিকভাবে অপমানিত করার চেষ্টা করতে পারে তেহরান।
সংঘাত আরও বাড়লে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে, যা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেবে। এতে মার্কিন ভোটারদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে এবং যুদ্ধ নিয়ে তাদের অসন্তোষ তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জেমস ওয়াকিনশ এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি এমন অর্থনৈতিক ক্ষয়যুদ্ধে আগ্রহী নন, যার মূল্য মার্কিন জনগণকে দিতে হবে। মা//জ//ন
Leave a Reply