admin
১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ৬:০৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

আমের রোগ বালাই ও প্রতিকার

বাংলাদেশে আম হচ্ছে সর্বাধিক জনপ্রিয় ফল। উৎকৃষ্ট জাতের আম স্বাদে গন্ধে ও দেখতে খুবই আকর্ষণীয় তাই এর সাথে অন্য কোনো ফলের তুলনা হয় না।

 

আম এমন একটি ফল যা ছোট থেকে শুরু করে পাকা পর্যন্ত সব অবস্থায় খাওয়া যায়। আম পছন্দ করে না এমন লোক হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেজন্যই আমকে ফলের রাজা বলা হয়ে থাকে।

আম বাংলাদেশের প্রধান চাষযোগ্য অর্থকরী ফলগুলোর মধ্যে অন্যতম। বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার, পুষ্টিমান এবং স্বাদ গন্ধে একটি অতুলনীয় ফল।

 

উপমহাদেশে আম সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল। তাই আম সব ফলের সেরা। বাংলাদেশে আম চাষাবাদের এলাকা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।আমদানী ও উদ্ভাবন হচ্ছে নতুন নতুন জাত। তবে আমাদের দেশে আম চাষে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো প্রতিহত করতে না পারলে আম চাষ লাভজনক হয় না। এর মধ্যে আমের নানা ধরনের রোগজনিত সমস্যা ও তাদের দমন ব্যবস্থাপনা সম্বন্ধে নিম্নে আলোচনা করা হলো-

জেনে নিন>>  নতুন তৈলবীজ পেরিলা পরিবর্তন আনতে পারে দেশের অর্থনীতিতে

এনথ্রাকনোজ : এই রোগের আক্রমণে গাছের কচি পাতা, কা-, কুঁড়ি, মুকুল ও ফলে দেখা যায়। পাতায় অসমান আকৃতির ধূসর বাদামি বা কালচে রঙের দাগ পড়ে।

পাশাপাশি কয়েকটি দাগ একত্রিত হয়ে বড় দাগের সৃষ্টি করে। বেশি আক্রান্ত হলে পাতা ঝরে পড়ে। আমের মুকুল বা ফুল আক্রান্ত হলে কালো দাগ দেখা দেয়।

ফুল আক্রান্ত হলে তা মারা যায় এবং ঝরে পড়ে। মুকুল আক্রান্ত হলে ফলধারণ ব্যাহত হয়। আম ছোট অবস্থায় আক্রান্ত হলে আমের গায়ে কালো দাগ দেখা দেয়।

আক্রান্ত ছোট আম ঝরে পড়ে। বাড়ন্ত আমে রোগের জীবাণু আক্রমণ হলে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। পাকা আমে ধূসর বাদামি বা কালো দাগের সৃষ্টি করে।

গুদামের আবহাওয়া অনুকূল হলে রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে। আম বড় হওয়ার সময় ঘন ঘন বৃষ্টি ও মেঘলা আবহাওয়া বিরাজ করলে আমে আক্রমণ বেশি দেখা যায়।

 

প্রতিকার : রোগাক্রান্ত বা মরা ডালপালা ছাঁটাই করে পুড়ে ফেলতে হবে। গাছের রোগাক্রান্ত ঝরা পাতা ও ঝরে পড়া আম সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে মাটির নিচে পুঁতে দিতে হবে।

মুকুলে রোগের আক্রমণ প্রতিহত করতে হলে মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে। মুকুল ১০-১৫ সেমি. লম্বা হলে প্রথম স্প্র্রে শেষ করতে হবে।

 

আম মটর দানার মতো হলে দ্বিতীয় বার স্প্রে করতে হবে। কীটনাশকের এবং ছত্রাকনাশক মিশিয়ে একত্রে মিশিয়ে স্প্রে করা যেতে পারে। বাড়ন্ত আমকে রোগমুক্ত রাখতে হলে আম সংগ্রহের ১৫ দিন আগ পর্যন্ত মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক বা একরোবেট এম জেড প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে বা ব্যভিস্টিন প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে ১৫ দিনের ব্যবধানে ৩/৪ বার স্প্রে করতে হবে।

গাছ থেকে আম পাড়ার পরপরই গরম পানিতে (৫৫০ সে. তাপমাত্রায় ৫ মিনিট) ডুবিয়ে রাখার পর শুকিয়ে অর্থাৎ গরম পানিতে শোধন করে গুদামজাত করতে হবে।

বোঁটা পচা : আম গাছ থেকে পাড়ার পর পাকতে শুরু করলে বোঁটা পচা রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। প্রথমে বোঁটায় বাদামি অথবা কালো দাগ দেখা দেয়।

দাগ দ্রুত বাড়তে থাকে এবং গোলাকার হয়ে বোঁটার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। জীবাণু ফলের ভেতর প্রবেশ করে সমস্ত ফল আক্রান্ত হয়ে যায়।

আক্রান্ত আম ২/৩ দিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। রোগের জীবাণু বোঁটা ছাড়াও অন্যান্য আঘাত প্রাপ্ত স্থান দিয়ে আমের ভেতরে প্রবেশ করে আম আস্তে আস্তে পচে যায়।

প্রতিকার : রোদ্রোজ্জ্বল দিনে গাছ থেকে আম পাড়তে হবে। আম পাড়ার সময় যাতে আঘাত না পায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ৫ সেমি. (২ ইঞ্চি) বোঁটাসহ আম পাড়লে এ রোগের আক্রমণ কমে যায়।

আম পাড়ার পর গাছের তলায় জমা না রেখে দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। আম পাড়ার পর পরই গরম পানিতে (৫৫০ সে. তাপমাত্রার পানিতে ৫-৭ মিনিট) অথবা বাভিস্টিন দ্রবণে (প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম) ৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখার পর গুদামজাত করলে বোঁটা পচা রোগের আক্রমণ অনেকাংশে কমে যায়।

জেনে নিন>> পটল চাষ:এক বার রোপণ করলে টানা চার বছর বিক্রি

আমের আঠা ঝরা এবং হঠাৎ মড়ক : বর্তমানে আম গাছের যেসব রোগ দেখা যায় তাদের মধ্যে আমের আঠা ঝরা এবং হঠাৎ মড়ক সবচেয়ে মারাত্মক।

কারণ এ রোগে আক্রান্ত গাছ খুব অল্প সময়ের মধ্যে মারা যায় । প্রথমে কা- অথবা মোটা ডালের কিছু কিছু জায়গা থেকে হালকা বাদামি থেকে গাড় বাদামি রঙের আঠা বা রস বের হতে থাকে। বেশি আক্রান্ত ডগা বা ডালটি অল্প দিনের মধ্যেই মারা যায়।

কিছুদিন পর দেখা যায় আরেকটি ডাল একইভাবে মারা যাচ্ছে। এভাবে এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ গাছ মারা যেতে পারে।

প্রতিকার : গাছে মরা বা ঘন ডাল পালা থাকলে তা নিয়মিত ছাঁটাই করতে হবে। আঠা বা রস বের হওয়ার স্থানের আক্রান্ত সহ সুস্থ কিছু অংশ তুলে ফেলে সেখানে বোর্দোপেস্টের (১০০ গ্রাম তুঁতে ও ১০০ গ্রাম চুন ১ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করা যায়) প্রলেপ দিতে হবে।

আক্রান্ত ডাল কিছু সুস্থ অংশসহ কেটে পুড়ে ফেলতে হবে। কাটা অংশে রোগের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বোর্দোপেস্টের প্রলেপ দিতে হবে।

গাছে নতুন পাতা বের হলে মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ১৫ দিনের ব্যবধানে ২ বার স্প্রে করতে হবে।

 

আগামরা : এ রোগের জীবাণু প্রথমে কচি পাতায় আক্রমণ করে। আক্রান্ত পাতা বাদামি হয় এবং পাতার কিনারা মুড়িয়ে যায়। পাতাটি তাড়াতাড়ি মারা যায় ও শুকিয়ে যায়।

আক্রমণ পাতা থেকে এ রোগের জীবাণু কুড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ডগার সামনের দিকে মরে যায়।

মরা অংশ নিচের দিকে অগ্রসর হতে থাকে ফলে বহু দূর থেকে আগামরা রোগের লক্ষণ বোঝা যায়। ডগাটি লম্বালম্বিভাবে কাটলে বাদামি লম্বা দাগের সৃষ্টি করে। আক্রমণ বেশি হলে গাছ মারা যায়।

প্রতিকার : আক্রান্ত ডাল কিছু সুস্থ অংশসহ কেটে ফেলতে হবে। কাটা অংশ পুড়ে ফেলতে হবে। কাটা অংশে বোর্দো মিশ্রণ (১০০ গ্রাম তুঁতে ও ১০০ গ্রাম চুন ১ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করা যায়) প্রলেপ দিতে হবে।

গাছে নতুন পাতা বের হলে মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন- ডায়থেন এম ৪৫/ পেনকোজেব/ ইন্ডোফিল ইত্যাদি (প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে) ১৫ দিনের ব্যবধানে ২/৩ বার স্প্রে করতে হবে।

কাল প্রান্ত : ইটের ভাটা থেকে নির্গত ধোয়ায় কারণে এ রোগ হতে পারে। আমের বয়স দেড় মাস হলে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে।

আক্রান্ত আমের বোঁটার দিকের অংশ স্বাভাবিকভাবে বাড়লেও নিচের অংশ ঠিক মতো বাড়তে পারে না।

ফলে আমের গঠন বিকৃত হয়। নিচের অংশ কুঁচকে যায়, বেশি আক্রান্ত আমের নিচের অংশ কাল হয়ে যায়। কোনো কোনো সময় আমের বিকৃত অংশ ফেটে যেতে পারে এবং পচে যেতে পারে।

 

প্রতিকার : আম মার্বেল আকারের হলে প্রতি লিটার পানিতে ৫ গ্রাম বোরাক্স বা বোরিক পাউডার ১০-১৫ দিন পর পর ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে। ইটের ভাটা আম বাগান থেকে ২ কিমি. দূরে স্থাপন করতে হবে। ইটের ভাটার চিমনি কমপক্ষে ৩৭ মিটার (১২০ ফুট) উঁচু করতে হবে।

 

আম ফেটে যাওয়া : আম ছাড়াও কাঁঠাল, ডালিম, পেয়ারা ইত্যাদি ফল ফেটে যেতে দেখা যায়।

সব ধরনের ফল ফাটার কারণ মোটামুটিভাবে একই। মাটিতে রসের দ্রুত হ্রাস-বৃদ্ধি আম ফাটার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত।

আবহাওয়া শুকনা হলে এবং দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হলে আমের ওপরের খোসা শক্ত হয়ে যায়।

 

এরপর হঠাৎ বৃষ্টিপাত হলে বা সেচ প্রদান করলে আম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। আমের ভেতরের দিক ঠিকমতো বাড়লেও বাহিরের আবরণ শক্ত হওয়ার কারণে তা বাড়তে পারে না। এ অবস্থায় আম ফেটে যায়। মাটিতে বোরণের ঘাটতি থাকলেও আম ফাটতে সহায়তা করে বলে জানা যায়।

 

প্রতিকার মাটিতে প্রচুর পরিমাণে জৈব সার দিতে হবে। জৈব সার মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে ফলে শুকনা বা খরার সময়ও মাটিতে যথেষ্ট রস থাকবে। জৈব সারের মধ্যে গোবর সব চেয়ে উত্তম বলে বিবেচিত। সার দেয়ার মৌসুমে ২০ বছর বা তদূর্ধ্ববয়সের গাছে ৫০ গ্রাম বোরাক্স বা বোরিক এসিড প্রয়োগ করতে হবে।

 

আম চাষি ভাইয়েরা উপরোক্ত বিষয়গুলো সময় মতো সঠিকভাবে মেনে চললে উপরোক্ত রোগ হতে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।

যেহেতু অন্যান্য ফসলের মতো আমেও বেশ কিছু রোগের আক্রমণ হয় যা আমের উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। তাই আমের উৎপাদন বাড়াতে হলে রোগ দমন ব্যবস্থাপনা জানা এবং মেনে চলা অপরিহার্য।

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জনই লক্ষ্য নয়, আখিরাতের সফলতার জন্যও কাজ করতে হবে: এটিএম আজহার

গুলশানে নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ, গ্রেপ্তার ২

জাপানের কাছে বড় হারে হকি জুনিয়র বিশ্বকাপের স্বপ্নভঙ্গ বাংলাদেশের

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দামে রেকর্ড, পাম্পের ডিসপ্লেতে জায়গা হচ্ছে না নতুন দামের

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মার পানি বৃদ্ধি: আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দী, তলিয়েছে ৩৬২ হেক্টর ফসলি জমি

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫ পদে নিয়োগ: প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকসহ আবেদনের সুযোগ

প্রবাসীদের পাসপোর্ট ও এনআইডি সেবা সহজ করতে ৪১ দেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ

ভারতের কাছে হেরে এশিয়া কাপ থেকে বিদায় বাংলাদেশের, ব্যাটিং ব্যর্থতায় আক্ষেপ

ব্যয় সংকোচনের চাপে নিম্নআয়ের মানুষ, আইএমএফের নীতি নিয়ে অক্সফামের উদ্বেগ

নতুন দায়িত্ব পেলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. মঈন খান

১০

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠন সম্পন্ন

১১

গৌরনদীতে শিক্ষার্থীদের মাঝে বৃক্ষরোপণ: প্রতিটি গাছের অভিভাবক এখন শিক্ষার্থীরা

১২

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ছাড়াল

১৩

ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান মানবিক বিপর্যয় ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতা

১৪

প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন ভ্যাট কাঠামো: ইউনিয়ন পর্যায়ে ৫০০ টাকা করের পরিকল্পনা এনবিআরের

১৫

ময়মনসিংহে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী যুবকের ওপর হামলা ও মৃত্যু

১৬

আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিচালক পদে নিয়োগ

১৭

ভূরুঙ্গামারীতে অধিক দামে সার বিক্রি করায় মোবাইল কোর্টে জরিমানা

১৮

দোহায় ইসরায়েলি হামলার এক বছর: উপসাগরীয় নিরাপত্তা কৌশলে বড় পরিবর্তন

১৯

নেপালের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার সৌজন্য সাক্ষাৎ

২০
error: Content is protected !!