গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর বিকাল ৩টা বেজে ৪৬ মিনিট। এই সময়টি কেবল কাতারের ইতিহাসে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। শান্তির দূত হিসেবে পরিচিত দোহা শহরে যুদ্ধবিরতি আলোচনারত অবস্থায় হামাসের প্রতিনিধিদলের ব্যবহৃত আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলা মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে এক গভীর সংকটের জন্ম দেয়।
এই ভয়াবহ হামলায় কাতার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর (লখুইয়া) ২২ বছর বয়সি সদস্য বদর সাদ মোহাম্মদ আল-হুমাইদি আল-দোসারিসহ বেশ কয়েকজন কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারান। এছাড়া হামলায় আরও অনেক নিরাপত্তাকর্মী ও সাধারণ নাগরিক আহত হন। এই ঘটনার এক বছর পূর্তি কেবল স্মরণের দিন নয়, বরং এটি আঞ্চলিক কাঠামোর রাজনৈতিক ও নৈতিক পরীক্ষার একটি মুহূর্ত।
ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির তিনটি মৌলিক ভিত্তিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। প্রথমত, সার্বভৌমত্ব শক্তির সীমার মধ্যে থাকা উচিত; দ্বিতীয়ত, মধ্যস্থতাকারীদের রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি; এবং তৃতীয়ত, আলোচনার টেবিলকে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিধি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা প্রয়োজন।
ইসরায়েল দাবি করেছিল যে তাদের লক্ষ্য ছিল হামাস, কাতার নয়। কিন্তু এই কৌশলগত যুক্তিটি ঘটনার ভয়াবহতাকে আড়াল করতে পারে না। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে শত্রুর উপস্থিতির অজুহাতে অন্য দেশের ওপর শক্তি প্রয়োগের কোনো বৈধতা নেই। কাতার যাদের আশ্রয় দিয়েছিল, তারা একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক আলোচনার প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং হামাসের মতো পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগের স্বার্থেই দোহা সেই নিরাপদ পরিসরটি তৈরি করেছিল, কারণ সরাসরি আলোচনার সুযোগ না থাকা পক্ষগুলোর জন্য একজন বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন ছিল।
মধ্যস্থতার মূল শর্তই হলো, আলোচনার আয়োজক দেশ ও সংশ্লিষ্ট পরিসরটি সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকতে হবে। যদি আলোচনার আয়োজক দেশেই মধ্যস্থতাকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়, তবে তা কেবল শারীরিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণই নয়, বরং রাজনৈতিকভাবেও অদূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হয়। এই হামলা ইসরায়েলি নীতির স্ববিরোধিতাকেও উন্মোচন করেছে। একদিকে কাতারকে হামাসের সাথে যোগাযোগের জন্য সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে, অন্যদিকে সেই যোগাযোগ মাধ্যমটিকেই জিম্মি মুক্তি ও যুদ্ধবিরতির কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও মানবাধিকার কমিশন এই হামলার নিন্দা জানিয়ে কাতারের সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিলেও, বড় শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল কেবল কূটনৈতিক স্তরে সীমাবদ্ধ। এটি প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় মধ্যস্থতাকারীদের আইনি ও রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ছোট রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব যদি বড় শক্তির সামরিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
তবে হামলার পরও কাতার তার মধ্যস্থতার ভূমিকা থেকে সরে দাঁড়ায়নি। দোহা তার মার্কিন, মিশরীয় এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে কাজ চালিয়ে গেছে। এর ফলস্বরূপ, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির কূটনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতেও কাতারকেই ফিরে আসতে হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে সহিংসতা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক নিয়ম নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। যারা শান্তি ও আলোচনার প্রত্যাশী, তাদের মনে রাখা উচিত যে আলোচনার টেবিল কখনোই সামরিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না।
কাতারের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ বান্দার আল-আইতাইবির এই বিশেষ নিবন্ধটি দোহা নিউজে প্রকাশিত প্রবন্ধের সম্পাদিত রূপ, যা বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক মূল্যবোধের সংকটকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
সূত্র: গালফ বাংলা
মন্তব্য করুন