ফিলিস্তিনিদের বর্তমান অবস্থা অনেকটা বন্দিশিবিরের মতো। গাজা ও পশ্চিম তীরের বাসিন্দারা ভবিষ্যতের কোনো আশা ছাড়াই কেবল টিকে থাকার লড়াই করছেন। ইসরায়েলি বাহিনীর অবিরাম হামলায় গাজা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও, হামাস নির্মূলের অজুহাতে তিনি ও তার সহযোগীরা অমানবিক ও বর্বর অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিশ্বের মনোযোগ এখন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের দিকে। এই সুযোগে ইসরায়েল কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফিলিস্তিনে তাদের ভূখণ্ড দখল ও হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় আরও ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
ইসরায়েলের এই আগ্রাসনের পেছনে রয়েছে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধের অভাবনীয় বিজয় ইসরায়েলি নেতাদের এই পরিকল্পনার দিকে ধাবিত করে। ১৯৭৭ সালে মেনাখেম বেগিন ও লিকুদ পার্টি ক্ষমতায় আসার পর এই উগ্র ডানপন্থী আদর্শ আরও দ্রুত বাস্তবায়িত হতে থাকে।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকেই পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন শুরু হয়। ১৯৭২ সালে বসতির সংখ্যা ছিল ১৪টি, যা চার বছরের মধ্যে বেড়ে ২০টিতে দাঁড়ায় এবং বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা ৩ হাজার ২০০ জনে পৌঁছায়। বর্তমানে এই সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তি এবং ১৯৯৪ সালের গাজা-জেরিকো চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের স্বায়ত্তশাসনের আশা তৈরি হলেও, ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণের নীতি তা নস্যাৎ করে দিয়েছে। ১৯৯৫ সালের দ্বিতীয় অসলো চুক্তিতে পশ্চিম তীরকে এ, বি ও সি এলাকায় ভাগ করা হয়, যা পরিস্থিতির জটিলতা আরও বাড়িয়েছে।
সম্প্রতি কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, নরওয়ে, স্পেন, যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক যৌথ বিবৃতিতে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা স্পষ্ট করেছেন যে, বসতি সম্প্রসারণ ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করছে। বিবৃতিতে অবিলম্বে বসতি সম্প্রসারণ ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নেতানিয়াহুর উগ্র ডানপন্থী মন্ত্রিসভা শুরু থেকেই দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ঘোর বিরোধী। তবে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলকে এমন ঐক্যবদ্ধ পশ্চিমা অবস্থানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশ্ব সম্প্রদায় ও আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে এই বিষয়ে আরও জোরালো পদক্ষেপ ও সমর্থন প্রয়োজন, যাতে ফিলিস্তিনিদের ওপর এই দীর্ঘস্থায়ী গণহত্যার অবসান ঘটে।
মন্তব্য করুন