আইন প্রণয়ন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি ও প্রচলিত রীতিনীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইন পাস এবং স্থায়ী কমিটি গঠনে সরকারি দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার অপব্যবহারের নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সংসদীয় কমিটিগুলোর ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে নতুন আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে টিআইবি।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ পাসের ক্ষেত্রে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জনমত যাচাই বা বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব এবং সংশোধনী দেওয়ার সুযোগও যথাযথভাবে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। টিআইবির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচলিত সংসদীয় রীতি অনুযায়ী যেকোনো বিল উত্থাপনের আগে সংসদ সদস্যদের কাছে এর অনুলিপি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিলের ক্ষেত্রে উত্থাপনের ঠিক আগমুহূর্তে অনুলিপি দেওয়া হয়, যার ফলে বিলটি যাচাই-বাছাই ও আলোচনা করার জন্য সংসদ সদস্যরা বাস্তবসম্মত কোনো সুযোগ পাননি।
এ ছাড়া ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এবং ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সম্পূরক কার্যসূচির মাধ্যমে সংসদে উত্থাপনের অভিযোগও করেছে সংস্থাটি। বিরোধী দলের আপত্তি ও মতামত উপেক্ষা করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কয়েকটি বিল দ্রুত পাস করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে টিআইবি। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ও সংসদীয় বিধি লঙ্ঘনের এমন চর্চা চলতে থাকলে কর্তৃত্ববাদী আমলের সংসদের সঙ্গে বর্তমান সংসদের পার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও প্রচলিত চর্চার ব্যত্যয় ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির দাবি, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে অর্থ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে। এতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সংসদীয় কমিটির নজরদারি ও জবাবদিহির কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বিতর্কিত বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সংসদীয় কমিটির সদস্য বা সভাপতি করা হলে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এসব কমিটির সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এ সময় জুলাই জাতীয় সনদের ধারা ২৪-এর অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আহ্বান জানায় টিআইবি। সংস্থাটি বলেছে, সরকারি হিসাব কমিটি, বিশেষ অধিকার কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর অঙ্গীকার রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদেও আসনসংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলের সদস্যদের নির্বাচিত করার কথা রয়েছে।
টিআইবি ইতিমধ্যে গঠিত বিতর্কিত কমিটিগুলো পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সরকারের ঘোষিত অবস্থানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ৭৮(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে সব অংশীজনকে নিয়ে দ্রুত নতুন আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া জুলাই জাতীয় সনদে উল্লিখিত চারটি সংসদীয় কমিটির প্রতিটিতে অন্তত একজন করে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি প্রত্যেক নারী সদস্যকে অন্তত একটি সংসদীয় কমিটিতে রাখার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
Leave a Reply