ঈদের প্রথম সুবহে সাদিকের আলো ছুঁয়ে যখন জেগে ওঠে আসমান, তখন এনায়েতপুর যেন পরিণত হয় এক স্বর্গীয় আলোয় মোড়া শান্তির উপত্যকায়।
চৌহালী উপজেলার এনায়েতপুরের পুণ্যভূমিতে অবস্থিত বিশ্বশান্তি মঞ্জিল পাক দরবার শরীফ, যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আধ্যাত্মিক যুগশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ, শান্তির মহান দিশারি, খাজা শাহ মুহাম্মদ ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রহ.) তাঁর স্মৃতির মগ্নতায় এদিন সকাল ৮:১৫ মিনিটে অনুষ্ঠিত হয় সিরাজগঞ্জ জেলার সবচেয়ে বৃহৎ এবং হৃদয়ভেদী ঈদুল আযহার জামাত।
দিগন্তবিস্তৃত মাঠজুড়ে সেই মুহূর্তে যেন সময় থেমে দাঁড়ায়। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা হাজারো আশেকান, মুরিদ, ও তাওহীদপ্রেমী মানুষ এক অন্তর্জাগতিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমবেত হন সেখানে। মাঠজুড়ে বিস্তৃত শ্রদ্ধানত হৃদয়, চোখে কান্না, আর কণ্ঠে উচ্চারিত “আল্লাহু আকবার” ধ্বনিতে সৃষ্টি হয় এক স্বর্গসুষমায় ভরা ধ্বনি-প্রতিধ্বনি।
প্রতিটি রুকু, প্রতিটি সেজদা যেন ছিল এক অনবদ্য আত্মসমর্পণ আত্মাকে উৎসর্গ করার এক অনিন্দ্য মহাযাত্রা। কুরবানির প্রকৃত তাৎপর্য সেখানে শুধু কোনো ঐতিহ্য নয়, বরং রূহের এক নিবেদন, এক নির্ভেজাল ভালোবাসা মহান প্রভুর দরবারে।
নামাজ শেষে, গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার আবেশে মুসল্লিরা ছুটে যান খাজা ইউনুছ আলী (রহ.)-এর পবিত্র মাজার শরীফে, সেখানে সিক্ত হন তাঁর নূরানী উপস্থিতির ছায়ায়। অতঃপর দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন, মহাত্মা মুর্শিদ, খাজা কামাল উদ্দিন নুহু মিয়া ক্বিবলা তাশরীফ এনে তুলেন তাঁর মোবারক হাত আকাশের পানে আর এক হৃদয়জাগানিয়া মোনাজাতে মাঠজুড়ে নেমে আসে রূহানিয়াতের কাঁপন।
“হে রব্বুল আলামিন! আমাদের এই কুরবানি তুমি কবুল করো। আমাদের অন্তর করো পবিত্র কাচের মতো স্বচ্ছ, করো নির্মল। এই ভাঙা, যুদ্ধবিক্ষত, ব্যথাতুর পৃথিবীর প্রতিটি কোণে তুমি শান্তির ফুৎকার ছড়িয়ে দাও। আমাদের অন্তর জুড়ে ভালোবাসা ছড়াও, ঈমান জাগাও, আলোয় ভরিয়ে দাও আমাদের। আমাদের নবীজীর উম্মত হিসেবে করো কবুল, তুমি করো আমাদের একত্র!”
মোনাজাতের শব্দ বাতাসে মিশে গিয়ে যেন ফেরেশতাদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, আসমান ছুঁয়ে আবার ফিরে আসে মানুষের হৃদয়ে। এক অদ্ভুত নীরবতা ছড়িয়ে পড়ে তবে তা ছিল না শুন্যতা, বরং ছিল পূর্ণতা, কান্না ও করুণার সম্মিলিত আত্মার আরাধনা। সেই মুহূর্তে ঈদের আনন্দ যেন রূপ নেয় এক আত্মিক তাওবার উচ্ছ্বাসে, ভেসে চলে হৃদয়ের অলিন্দে অলিন্দে।
এ ছিল শুধুই একটি ঈদের জামাত নয় এ ছিল এক আত্মার উদযাপন, প্রেম ও প্রার্থনার মহামিলন; এক শান্তি-স্বপ্নময় সকালের ইতিহাস, যা আগামী দিনগুলোতেও আশেকানদের হৃদয়ে বয়ে চলবে নীরবে, নিরালায়।
Leave a Reply