শ্রাবণের মেঘলা বিকেলে বরিশালের বাকেরগঞ্জের কলসকাঠি পালপাড়ার একটি ছোট্ট কর্মশালায় টিমটিমে বৈদ্যুতিক বাতির নিচে নিবিষ্ট মনে কাজ করছিলেন সমীর পাল। চারপাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে সারি সারি সাদা মাটির ঘট। কোনোটি খড়িমাটির প্রলেপে ঢাকা, আবার কোনোটিতে হলুদ রঙের আঁচড়ে ফুটে উঠছে দেবীর অবয়ব। মেঝেতে বসে সরু তুলি হাতে সমীর নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলছেন দেবী মনসার মুখ, কালো চুল, লাল শাড়ি এবং মাথার ওপর ফণা তোলা সাপের প্রতিকৃতি। শ্রাবণসংক্রান্তিকে ঘিরে আয়োজিত মনসাপূজার অন্যতম প্রধান উপকরণ এই ঘট তৈরির কাজে এখন চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি।
বাংলার লোকবিশ্বাসে সর্পদেবী মনসার পূজা বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব থেকে রক্ষা এবং পরিবারের সমৃদ্ধি কামনায় করা হয়। বরিশাল অঞ্চলে এই পূজার ঐতিহ্যের সঙ্গে কবি বিজয় গুপ্ত ও মনসামঙ্গল কাব্যের স্মৃতি গভীরভাবে মিশে আছে। গত ৩০ জুলাই পূজার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে কলসকাঠির পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, মৃৎশিল্পীদের কর্মযজ্ঞ। একসময় এলাকার প্রায় প্রতিটি পাল পরিবারই মনসাঘট তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই চিত্র বদলে গেছে। বর্তমানে কলসকাঠির প্রায় ২০টি পাল পরিবারের মধ্যে সমীর পালই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এখনো এই বিশেষ ঘট তৈরির ধারাটি টিকিয়ে রেখেছেন।
সমীর পালের বয়স এখন ৩৫ বছর। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা নারায়ণ চন্দ্র পালের কাছ থেকে তিনি মৃৎশিল্পের হাতেখড়ি নেন। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবাকে কাজে সহায়তা করতেন তিনি। প্রায় ১৫ বছর আগে বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরতে হয় সমীরকে। তখন তিনি এইচএসসি পাস করেছেন। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে পড়াশোনা ছেড়ে পুরোদমে মৃৎশিল্পের কাজে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। বর্তমানে সমীরের সংসারে স্ত্রী অনিমা, দেড় বছরের শিশুকন্যা শ্রেয়সী এবং বৃদ্ধ মা পুষ্প রানী রয়েছেন। তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব এই শিল্পের ওপরই নির্ভর করে।
মনসাপূজার ইতিহাস বাংলার সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। চাঁদ সওদাগর ও বেহুলার সেই চিরন্তন কাহিনি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। বরিশালের আগৈলঝাড়ার গৈলায় কবি বিজয় গুপ্তের স্মৃতিবিজড়িত মনসামন্দিরে প্রতি বছর শ্রাবণ মাসে বিশেষ আয়োজন হয়। বরিশাল চারুকলার সংগঠক ও মৃৎশিল্প গবেষক সুশান্ত ঘোষের মতে, বরিশালের ঘটের গঠনশৈলী অন্যান্য এলাকার তুলনায় স্বতন্ত্র। এর আকৃতির সঙ্গে পবিত্রতা ও উর্বরতার প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে, যা স্থানীয় মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে আছে।
সমীর পাল জানান, এবার তিনি প্রায় ১৫০টি মনসাঘট তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছেন। প্রতিটি ঘটের দাম ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে একটি ঘট তৈরিতে খরচ পড়ে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। তবে আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, আগের মতো এখন আর এই শিল্পের চাহিদা নেই। বর্তমান বাজারে মৃৎশিল্পের আয় দিয়ে সংসার চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও পূর্বপুরুষের পেশা হিসেবে তিনি এই কাজ আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।
একসময় যে পালপাড়ায় বহু কারিগর মনসাঘট তৈরির প্রতিযোগিতায় মেতে থাকতেন, সেখানে এখন সমীরই শেষ ভরসা। সমীরের হাতে তৈরি প্রতিটি মাটির ঘট পূজার আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই কারিগরের দক্ষতা ও উত্তরাধিকার কি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে টিকে থাকবে? সমীর পালের এই লড়াই কেবল একটি পেশা ধরে রাখার নয়, বরং একটি অঞ্চলের লোকজ ঐতিহ্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানোর নিরন্তর চেষ্টা।
সূত্র: প্রথম আলো
Leave a Reply