বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রশাসনিক কাঠামোর বড় ধরনের রদবদলের অংশ হিসেবে সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ও জনসংযোগ কর্মকর্তা বোসরা ইসলামকে তার বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট এ সংক্রান্ত একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়।
উক্ত আদেশে তাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (এমডি ও সিইও) দপ্তরে ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) হিসেবে সংযুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পার্সোনেল শাখার ব্যবস্থাপক উম্মে কুলসুমের স্বাক্ষরে এই প্রশাসনিক আদেশটি কার্যকর করা হয়। তার স্থলে করপোরেট প্ল্যানিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মহিউদ্দিনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জনসংযোগের কাজ পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বোসরা ইসলামের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে গণমাধ্যমে সঠিক তথ্য সরবরাহে গাফিলতি এবং সংকটকালীন ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে সম্প্রতি ইতালির রোমে বিমানের একটি ফ্লাইট কারিগরি ত্রুটির কারণে আটকে পড়ার ঘটনায় জনসংযোগ বিভাগের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
গত ৬ আগস্ট কানাডার টরন্টো থেকে ২৫৯ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া বিজি-৩০৬ ফ্লাইটটি জ্বালানি নেওয়ার জন্য রোমে অবতরণ করে। সেখানে উড়োজাহাজটিতে কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়লে প্রায় ৮ ঘণ্টা চেষ্টার পরও তা মেরামত করা সম্ভব হয়নি। ফলে ফ্লাইটটি গ্রাউন্ডেড করতে হয় এবং যাত্রীদের দীর্ঘ সময় চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এই সংকটময় মুহূর্তে সঠিক তথ্য আদান-প্রদান না করায় বিমানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, রোমে ফ্লাইট আটকে পড়ার ঘটনার সময় যাত্রীদের কাছে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া এবং গণমাধ্যমের সাথে সমন্বয়ের অভাব ছিল স্পষ্ট। এই ব্যর্থতা বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিমানের বিভিন্ন তদন্তাধীন বিষয়েও বোসরা ইসলামের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে শামীমা পারভিন ও শাহজাহান দম্পতির বিরুদ্ধে ওঠা মানবপাচার ও অনিয়মের তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার প্রচেষ্টায় তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শামীমা পারভিনের সাথে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়টিও এখন বিমানের অন্দরমহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেও বোসরা ইসলাম বিমানের ভেতরে নিজের প্রভাব বজায় রেখেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিমানের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিভিল এভিয়েশন ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে তিনি পারিবারিক প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার দুলাভাই এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে সেই ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছেন। এমনকি বিমানের গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উঠেছে।
বোসরা ইসলামের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক। সূত্রের দাবি, তিনি শুরুতে জুনিয়র ট্রাফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট পদের নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পরবর্তীতে দুলাভাইয়ের প্রভাব খাটিয়ে তিনি বিমানের গ্রুপ-৬-এ চাকরি বাগিয়ে নেন। তার আপন ছোটবোন নাজমুনও বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এভাবে পারিবারিক বলয় তৈরি করে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানে নিজের অবস্থান শক্ত করে রেখেছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে যে, নিয়োগ থেকে শুরু করে কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নানাভাবে সহায়তা করার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের। প্রশাসনিক এই পরিবর্তনের মাধ্যমে বিমান কর্তৃপক্ষ এখন তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের তদন্তের দিকে এগোচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বোসরা ইসলামের বক্তব্য জানার জন্য গত তিনদিন ধরে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে তার পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাওয়া যায়নি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ এখন এই রদবদলের মাধ্যমে জনসংযোগ বিভাগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চায়। রোমের ঘটনার পর থেকে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই সংস্থার সেবার মান ও ভাবমূর্তি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা কাটিয়ে উঠতেই এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিমানে স্বপদে বহাল থেকে বোসরা ইসলাম প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরে তাদের নামিয়ে বিমানবন্দরের ভেতরে নেওয়া হয়।তবে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ইতালিতে প্রবেশের অনুমতি না থাকায় অধিকাংশ যাত্রীকে বিমানবন্দরেই অবস্থান করতে হয়। রোমে ফ্লাইট আটকে পড়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও বিমানের ভেতরে তার প্রভাব ও কর্তৃত্বে বড় কোনো ছেদ পড়েনি।
যু//র
Leave a Reply