কক্সবাজার পর্যটন জোনের শরণ আবাসিক প্রকল্পে অবস্থিত ‘সাগর কান্তা গেস্ট হাউস’ নিয়ে তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি। গেস্ট হাউসটির ভাড়াটিয়া নজিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মালিকের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া চুক্তিপত্র তৈরি, বিশ্বাসভঙ্গ, আমানত খেয়ানত এবং অনৈতিক ব্যবসা পরিচালনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রবাসী বন্ধু ফরিদুল আলমের সরলতাকে পুঁজি করে নজিরুল দীর্ঘদিন ধরে গেস্ট হাউসটি দখলে রেখে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
গেস্ট হাউসের মালিক ফরিদুল আলম, যিনি কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালীর বাসিন্দা, তিনি নজিরুলের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, গেস্ট হাউসটি ভাড়া নেওয়ার পর থেকেই নজিরুল সেখানে অবৈধ দেহব্যবসা ও প্রকাশ্যে ইয়াবা বেচাকেনাসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন। এসব কর্মকাণ্ডের সচিত্র প্রতিবেদন অতীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে গেস্ট হাউসটি ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হলেও নজিরুল ভাড়ার মেয়াদ শেষ না হওয়ার অজুহাতে দখল ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। ২০২৫ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি অবৈধভাবে দখল বজায় রাখেন। মালিকপক্ষের অভিযোগ, নজিরুল লাঠিয়াল বাহিনী ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে মালিককে চাপে রাখার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কয়েকজন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতার অনুরোধে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চতুর্থবারের মতো শর্তসাপেক্ষে চুক্তি করা হয়। সেই চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, কোনো অজুহাতেই আর নতুন চুক্তি করা হবে না এবং ছয় মাসের মধ্যে বকেয়া প্রায় ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে।
চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে নজিরুল দখল ছাড়ার পরিবর্তে মালিকের স্বাক্ষর জাল করে ২০২৭ সাল পর্যন্ত ভাড়ার মেয়াদ বাড়িয়ে নতুন স্ট্যাম্প ও চুক্তিপত্র তৈরি করেন। এ সময় মালিক ফরিদুল আলমকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। গত ১৩ আগস্ট আয়োজিত এক সালিশি বৈঠকে নজিরুলের তৈরি চুক্তিপত্রটি জাল হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং তার কাছে ৬ লাখ টাকা পাওনা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপর নজিরুলকে গেস্ট হাউসের দখল ছেড়ে দিতে হয়। তবে মালিকপক্ষের দাবি, দখল ছাড়ার আগেই রাতের আঁধারে তিনি গেস্ট হাউসের টেলিভিশন, চেয়ার-টেবিলসহ মূল্যবান মালামাল সরিয়ে নেন।
এর বিপরীতে, গত ২৫ আগস্ট নজিরুল ইসলাম কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ফরিদুল আলমসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেন। তার দাবি, তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগদ টাকা, মোটরসাইকেল ও ৪ লাখ টাকার চেকসহ গেস্ট হাউস থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি কক্সবাজার জেলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেও মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। তবে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে তিনি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৬-১৭ বছর ধরে নজিরুল এই গেস্ট হাউসটি নামমাত্র ভাড়ায় ভোগদখল করছেন। ২০১৭ সালে বছরে ৫ লাখ টাকা ভাড়ায় প্রথম আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়, যার শর্ত ছিল প্রতি বছর ভাড়া ৫০ হাজার টাকা করে বাড়বে। তারও সাত বছর আগে থেকে মালিক বিদেশে থাকায় বন্ধুত্বের খাতিরে নজিরুলকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। মালিকপক্ষের অভিযোগ, এই দীর্ঘ সময়ের সুযোগ নিয়ে নজিরুল স্বাক্ষর জালিয়াতি করে প্রতারণার জাল বিস্তার করেন।
গেস্ট হাউসটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের টার্গেট করে সংঘবদ্ধ প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পতিতা ও হিজড়াদের ব্যবহার করে পর্যটকদের প্রলোভিত করে গেস্ট হাউসে নিয়ে আসা হতো এবং পরে তাদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়া হতো। এছাড়া ইয়াবা দিয়ে প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে পর্যটকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
নজিরুল ইসলাম অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং তাকে পরিকল্পিতভাবে হয়রানি করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন। তবে মালিকপক্ষের অভিযোগের স্বপক্ষে বিভিন্ন নথিপত্র ও প্রশাসনিক বক্তব্যের ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। স্থানীয় সচেতন মহল এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসব কর্মকাণ্ড সাংবাদিকদের নজরে আসার পর বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও স্থানীয় একাধিক দৈনিকে একাধিকবার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
সূত্র: ডেইলি বাংলাদেশ
Leave a Reply