ঢাকা ০৭:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জাতিসংঘ মহাসচিবের সাথে কাতারের আমীরের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ৫১তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি: নিয়োগ পাবেন ৫ হাজার চিকিৎসক খুলনায় পৃথক অভিযানে ৪টি বিদেশি পিস্তলসহ আটক ২ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা কমলে কমবে জ্বালানি তেলের দাম পাইকগাছায় গভীর রাতে বসতঘর থেকে বিধবা নারী রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার গাজীপুরে ঝালমুড়ি বিক্রেতার ছুরিকাঘাতে পোশাককর্মী নিহত আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলা, সীমান্তে ফের উত্তাপ নীলফামারী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ১২ পদে নিয়োগ ভূরুঙ্গামারীতে গ্রাহকদের অধিকার আদায়ের দাবিতে ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের বিক্ষোভ মিছিল মধ্যপ্রাচ্য ইতিহাসের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে: কাতারের আমির

জ্বালানি সংকটে অসহায় উপদেষ্টা এবং উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা

সৃষ্টি প্রযুক্তি ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১০:৪০:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অক্টোবর ২০২২ ৩৭৮ বার পড়া হয়েছে

জ্বালানি সংকটে অসহায় উপদেষ্টা এবং উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা

(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রোববার(২৩ অক্টোবর) রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে শিল্প খাতে জ্বালানি সংকটের প্রভাব হ্রাস নিয়ে একটি আলোচনা সভা ডেকেছিল বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। এই সভাতেই ব্যবসায়ীরা গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট নিয়ে তাঁদের দাবিদাওয়া তুলে ধরেন। বিসিআইয়ের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন।
মূল প্রবন্ধে ইজাজ হোসেন জানান, দেশে মোট গ্যাসের ৪২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে, ১৮ শতাংশ শিল্পে, ক্যাপটিভ খাতে ১৬ শতাংশ ও সার উৎপাদনে ৬ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। বর্তমান বাস্তবতায় বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে তা শিল্পে সরবরাহের পরামর্শ দিয়েছেন ইজাজ হোসেন। গৃহস্থালি পর্যায়েও বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর পক্ষে মত দেন তিনি। এ ছাড়া স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন ইজাজ হোসেন।
এর আগে স্বাগত বক্তব্যে বিসিআইয়ের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, বর্তমানে যে সংকট চলছে, তা দ্রুত সমাধান করতে না পারলে মন্দা শুরু হতে পারে।

ব্যবসায়ীরা বললেন, সংকটে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে।দেশের বিভিন্ন খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা বলেছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় তাঁদের কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন কমছে। রপ্তানির ক্রয়াদেশও কমে যাচ্ছে।

এতে দুশ্চিন্তা বাড়ছে কর্মসংস্থান নিয়েই।
ব্যবসায়ী নেতারা এখন চান প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ। প্রয়োজনে দ্রুত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে সরকারকে শিল্পকারখানায় সরবরাহ করতে হবে। আবার কেউ বলছেন, বাসাবাড়ি, সার কারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে।
ব্যবসায়ীদের এসব প্রস্তাব শুনে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস দিতে পারেননি। বরং বলেছেন, দেশের রিজার্ভের বর্তমান যে অবস্থা, তাতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা সম্ভব নয়। আবার কৃষি উৎপাদন ঠিক রাখতে সার কারখানাতেও গ্যাসের সরবরাহ কমানো সম্ভব নয়। এ অবস্থায় উপদেষ্টার সমাধান হচ্ছে, সবাই মিলে শপথ করে দিনের বেলা বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ রাখা।

ব্যবসায়ী নেতাদের যত চাওয়া
বেলা ১১টায় আলোচনা অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর একে একে তৈরি পোশাকসহ দেশের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়ে তাঁদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের বেঙ্গল গ্রুপের অনেকগুলো কারখানা আছে সাভারে। প্রতিদিন সেখানকার কর্মীরা আমাকে ফোন করে বলেন, “স্যার, আপনি তো এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি, কিন্তু আমাদের কারখানা দৈনিক সাত-আট ঘণ্টা করে বন্ধ থাকে।”’
জসিম উদ্দিন আরও বলেন, সাহস নিয়ে ব্যবসায়ীরা শিল্প খাতে অনেক বিনিয়োগ করেছেন। ব্যাংকগুলোও সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ-জ্বালানিসংকটের কারণে আজকে সবার ডোবার মতো অবস্থা হয়েছে।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, চলতি বছরের শুরুতে চীন-ভিয়েতনাম থেকে ব্যবসা বাংলাদেশে চলে এসে ৩৮ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। আর এখন রপ্তানি সাড়ে ৭ শতাংশ নেতিবাচক হয়েছে। গ্যাস–সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় রাতের পালায় উৎপাদন বন্ধ থাকছে জানিয়ে এ কে আজাদ বলেন, স্থানীয় বিভিন্ন খাত থেকে ৫ শতাংশ গ্যাস শিল্প খাতে দিতে পারলে রাতের পালা চালু করা সম্ভব হবে।
গত তিন মাসে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে বলে জানান নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহসভাপতি আক্তার হোসেন। এ ছাড়া বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। আক্তার হোসেন বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের কাছে ইতিমধ্যে নেতিবাচক বার্তা চলে গেছে। শ্রীলঙ্কা থেকে ক্রেতারা চলে যাওয়ার পর এখনো সেখানে ফেরেননি। সংকট না কাটলে বাংলাদেশের বেলায়ও এমন পরিস্থিতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সহসভাপতি স্বপ্না ভৌমিক বলেন, ‘গত দুই মাসে আমি ২৭টি কারখানায় গিয়েছি। তবে যে অভিজ্ঞতা পেয়েছি, তা একটু ভয়ের।’ অন্যদিকে জ্বালানিসংকটের কারণে চিনি কলগুলোতে উৎপাদন ঠিক রাখা যাচ্ছে না বলে জানান চট্টগ্রাম চেম্বারের (সিসিসিআই) সভাপতি মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, এভাবে চললে চিনির দাম বেড়ে যেতে পারে।
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে গত কয়েক মাসে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় ক্রয়াদেশ, উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে বলে জানান মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ঢাকার (এমসিসিআই) সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো সংকটে ভুগছে না সেসব দেশ। ফলে তারা ক্রেতাদের আস্থা পাচ্ছে, আর আমরা আস্থা হারাচ্ছি।’
এমনিতে বাজার খারাপ, তার সঙ্গে চলছে গ্যাস–সংকট। এই অবস্থাকে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ বলে অভিহিত করেছেন বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী। বস্ত্রকলগুলোতে দৈনিক ১২ ঘণ্টা গ্যাস থাকে না বলে জানিয়েছেন তিনি। মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমাদের সময় ও সম্পদের অপচয় হচ্ছে। সব মিলিয়ে বস্ত্রকল খাত অত্যন্ত নাজুক অবস্থার মধ্যে আছে।’

কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক বিনায়ক সেন আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ ভারত অনেক দিন ধরেই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে আসছে। এ জন্য বিষয়টা তাদের কাছে নতুন মনে হয় না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদেরও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাস্তবিকভাবে দাম সমন্বয় করার সময় এসেছে।’
অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন আলোচক রিজার্ভের অর্থ দিয়ে গ্যাস আমদানি ও সার উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে বিনায়ক সেন বলেন, ‘খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা আমাদের মৌলিক বিবেচ্য বিষয়। গ্যাসের জন্য যদি অন্য কোনো খাত থেকে কৃচ্ছ্র সাধন করতে হয়, সেই পথ নিতে হবে। তবে কৃষি খাত যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা বিবেচনায় রাখতে হবে।’ প্রয়োজনে গৃহস্থালি খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমানোর পক্ষেও মত দেন বিনায়ক সেন। এ ছাড়া এত বছরেও দেশের জ্বালানি বহুমুখীকরণ কেন হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

উপদেষ্টার আশ্বস্ত করার চেষ্টা
অনুষ্ঠানে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার বিষয়ে তৌফিক-ই-ইলাহী বলেন, ‘স্পট মার্কেটে দাম অনেক বেশি। এটা কিনতে ছয় মাসে অন্তত ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার লাগতে পারে। কিন্তু আমাদের রিজার্ভের যে অবস্থা, তাতে এই সিদ্ধান্তে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আগামী ছয় মাসে রিজার্ভ বাড়ারও সম্ভাবনা নেই। এভাবে এলএনজি কেনা সম্ভব নয়। তারপরও সরকার বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে দেখবে।’
ব্যবসায়ীদের কথা শুনে বিভিন্ন জায়গায় গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্প খাতে সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানান তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমদানির সুযোগ যেহেতু কম, সেহেতু দেশের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে হলে কাউকে না কাউকে ব্যবহার কমাতে হবে। বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহ কমানো হলে লোডশেডিং বাড়বে। কিন্তু আমরা অঙ্ক করে দেখেছি, শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে হলে সরবরাহ কমানোর খাত হিসেবে বিদ্যুৎ খাত হবে উত্তম জায়গা।’তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী আশ্বাস দিয়ে বলেন, সরকার বিভিন্ন উপায়ে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ভোলায় আট কোটি ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ আছে। আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে এসব গ্যাস ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করা হবে। ব্যবসায়ীরা চাইলে সিএনজি স্টেশন থেকে নিয়ে কারখানায় তা ব্যবহার করতে পারবেন।

কয়লাভিত্তিক ও সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কাজ চলছে। এ ধরনের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হলে শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়বে। এ ছাড়া সরকারের একটি প্রতিনিধিদল শিগগিরই গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোতে আলোচনার জন্য যাবে। সেখান থেকেও কোনো ফল আসতে পারে।
তবে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর এসব আশ্বাসের মধ্যেই অনুষ্ঠানস্থলে দাঁড়িয়ে যান কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাঁরা সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দাবি করেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টার কাছ থেকে।

এ সময় তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আমরা সরকার থেকে যা করার দরকার হয় করব, আপনারা সাহস হারাবেন না। যদি প্রয়োজন হয়, আমরা এখানে যাঁরা আছি, তাঁরা সবাই শপথ নেব; দরকার হলে আমরা দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করব না।’তথ্য সুত্র ও ছবি

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

জ্বালানি সংকটে অসহায় উপদেষ্টা এবং উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা

আপডেট সময় : ১০:৪০:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অক্টোবর ২০২২

রোববার(২৩ অক্টোবর) রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে শিল্প খাতে জ্বালানি সংকটের প্রভাব হ্রাস নিয়ে একটি আলোচনা সভা ডেকেছিল বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। এই সভাতেই ব্যবসায়ীরা গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট নিয়ে তাঁদের দাবিদাওয়া তুলে ধরেন। বিসিআইয়ের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন।
মূল প্রবন্ধে ইজাজ হোসেন জানান, দেশে মোট গ্যাসের ৪২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে, ১৮ শতাংশ শিল্পে, ক্যাপটিভ খাতে ১৬ শতাংশ ও সার উৎপাদনে ৬ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। বর্তমান বাস্তবতায় বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে তা শিল্পে সরবরাহের পরামর্শ দিয়েছেন ইজাজ হোসেন। গৃহস্থালি পর্যায়েও বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর পক্ষে মত দেন তিনি। এ ছাড়া স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন ইজাজ হোসেন।
এর আগে স্বাগত বক্তব্যে বিসিআইয়ের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, বর্তমানে যে সংকট চলছে, তা দ্রুত সমাধান করতে না পারলে মন্দা শুরু হতে পারে।

ব্যবসায়ীরা বললেন, সংকটে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে।দেশের বিভিন্ন খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা বলেছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় তাঁদের কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন কমছে। রপ্তানির ক্রয়াদেশও কমে যাচ্ছে।

এতে দুশ্চিন্তা বাড়ছে কর্মসংস্থান নিয়েই।
ব্যবসায়ী নেতারা এখন চান প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ। প্রয়োজনে দ্রুত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে সরকারকে শিল্পকারখানায় সরবরাহ করতে হবে। আবার কেউ বলছেন, বাসাবাড়ি, সার কারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে।
ব্যবসায়ীদের এসব প্রস্তাব শুনে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস দিতে পারেননি। বরং বলেছেন, দেশের রিজার্ভের বর্তমান যে অবস্থা, তাতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা সম্ভব নয়। আবার কৃষি উৎপাদন ঠিক রাখতে সার কারখানাতেও গ্যাসের সরবরাহ কমানো সম্ভব নয়। এ অবস্থায় উপদেষ্টার সমাধান হচ্ছে, সবাই মিলে শপথ করে দিনের বেলা বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ রাখা।

ব্যবসায়ী নেতাদের যত চাওয়া
বেলা ১১টায় আলোচনা অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর একে একে তৈরি পোশাকসহ দেশের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়ে তাঁদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের বেঙ্গল গ্রুপের অনেকগুলো কারখানা আছে সাভারে। প্রতিদিন সেখানকার কর্মীরা আমাকে ফোন করে বলেন, “স্যার, আপনি তো এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি, কিন্তু আমাদের কারখানা দৈনিক সাত-আট ঘণ্টা করে বন্ধ থাকে।”’
জসিম উদ্দিন আরও বলেন, সাহস নিয়ে ব্যবসায়ীরা শিল্প খাতে অনেক বিনিয়োগ করেছেন। ব্যাংকগুলোও সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ-জ্বালানিসংকটের কারণে আজকে সবার ডোবার মতো অবস্থা হয়েছে।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, চলতি বছরের শুরুতে চীন-ভিয়েতনাম থেকে ব্যবসা বাংলাদেশে চলে এসে ৩৮ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। আর এখন রপ্তানি সাড়ে ৭ শতাংশ নেতিবাচক হয়েছে। গ্যাস–সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় রাতের পালায় উৎপাদন বন্ধ থাকছে জানিয়ে এ কে আজাদ বলেন, স্থানীয় বিভিন্ন খাত থেকে ৫ শতাংশ গ্যাস শিল্প খাতে দিতে পারলে রাতের পালা চালু করা সম্ভব হবে।
গত তিন মাসে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে বলে জানান নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহসভাপতি আক্তার হোসেন। এ ছাড়া বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। আক্তার হোসেন বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের কাছে ইতিমধ্যে নেতিবাচক বার্তা চলে গেছে। শ্রীলঙ্কা থেকে ক্রেতারা চলে যাওয়ার পর এখনো সেখানে ফেরেননি। সংকট না কাটলে বাংলাদেশের বেলায়ও এমন পরিস্থিতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সহসভাপতি স্বপ্না ভৌমিক বলেন, ‘গত দুই মাসে আমি ২৭টি কারখানায় গিয়েছি। তবে যে অভিজ্ঞতা পেয়েছি, তা একটু ভয়ের।’ অন্যদিকে জ্বালানিসংকটের কারণে চিনি কলগুলোতে উৎপাদন ঠিক রাখা যাচ্ছে না বলে জানান চট্টগ্রাম চেম্বারের (সিসিসিআই) সভাপতি মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, এভাবে চললে চিনির দাম বেড়ে যেতে পারে।
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে গত কয়েক মাসে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় ক্রয়াদেশ, উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে বলে জানান মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ঢাকার (এমসিসিআই) সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো সংকটে ভুগছে না সেসব দেশ। ফলে তারা ক্রেতাদের আস্থা পাচ্ছে, আর আমরা আস্থা হারাচ্ছি।’
এমনিতে বাজার খারাপ, তার সঙ্গে চলছে গ্যাস–সংকট। এই অবস্থাকে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ বলে অভিহিত করেছেন বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী। বস্ত্রকলগুলোতে দৈনিক ১২ ঘণ্টা গ্যাস থাকে না বলে জানিয়েছেন তিনি। মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমাদের সময় ও সম্পদের অপচয় হচ্ছে। সব মিলিয়ে বস্ত্রকল খাত অত্যন্ত নাজুক অবস্থার মধ্যে আছে।’

কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক বিনায়ক সেন আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ ভারত অনেক দিন ধরেই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে আসছে। এ জন্য বিষয়টা তাদের কাছে নতুন মনে হয় না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদেরও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাস্তবিকভাবে দাম সমন্বয় করার সময় এসেছে।’
অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন আলোচক রিজার্ভের অর্থ দিয়ে গ্যাস আমদানি ও সার উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে বিনায়ক সেন বলেন, ‘খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা আমাদের মৌলিক বিবেচ্য বিষয়। গ্যাসের জন্য যদি অন্য কোনো খাত থেকে কৃচ্ছ্র সাধন করতে হয়, সেই পথ নিতে হবে। তবে কৃষি খাত যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা বিবেচনায় রাখতে হবে।’ প্রয়োজনে গৃহস্থালি খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমানোর পক্ষেও মত দেন বিনায়ক সেন। এ ছাড়া এত বছরেও দেশের জ্বালানি বহুমুখীকরণ কেন হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

উপদেষ্টার আশ্বস্ত করার চেষ্টা
অনুষ্ঠানে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার বিষয়ে তৌফিক-ই-ইলাহী বলেন, ‘স্পট মার্কেটে দাম অনেক বেশি। এটা কিনতে ছয় মাসে অন্তত ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার লাগতে পারে। কিন্তু আমাদের রিজার্ভের যে অবস্থা, তাতে এই সিদ্ধান্তে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আগামী ছয় মাসে রিজার্ভ বাড়ারও সম্ভাবনা নেই। এভাবে এলএনজি কেনা সম্ভব নয়। তারপরও সরকার বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে দেখবে।’
ব্যবসায়ীদের কথা শুনে বিভিন্ন জায়গায় গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্প খাতে সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানান তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমদানির সুযোগ যেহেতু কম, সেহেতু দেশের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে হলে কাউকে না কাউকে ব্যবহার কমাতে হবে। বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহ কমানো হলে লোডশেডিং বাড়বে। কিন্তু আমরা অঙ্ক করে দেখেছি, শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে হলে সরবরাহ কমানোর খাত হিসেবে বিদ্যুৎ খাত হবে উত্তম জায়গা।’তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী আশ্বাস দিয়ে বলেন, সরকার বিভিন্ন উপায়ে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ভোলায় আট কোটি ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ আছে। আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে এসব গ্যাস ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করা হবে। ব্যবসায়ীরা চাইলে সিএনজি স্টেশন থেকে নিয়ে কারখানায় তা ব্যবহার করতে পারবেন।

কয়লাভিত্তিক ও সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কাজ চলছে। এ ধরনের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হলে শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়বে। এ ছাড়া সরকারের একটি প্রতিনিধিদল শিগগিরই গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোতে আলোচনার জন্য যাবে। সেখান থেকেও কোনো ফল আসতে পারে।
তবে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর এসব আশ্বাসের মধ্যেই অনুষ্ঠানস্থলে দাঁড়িয়ে যান কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাঁরা সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দাবি করেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টার কাছ থেকে।

এ সময় তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আমরা সরকার থেকে যা করার দরকার হয় করব, আপনারা সাহস হারাবেন না। যদি প্রয়োজন হয়, আমরা এখানে যাঁরা আছি, তাঁরা সবাই শপথ নেব; দরকার হলে আমরা দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করব না।’তথ্য সুত্র ও ছবি

Facebook Comments Box