রংপুরে এসএসসি পরীক্ষায় ২৮ তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী
- আপডেট সময় : ০৩:১৮:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ২৭৩৪৫ বার পড়া হয়েছে
রংপুরে এসএসসি পরীক্ষায় ২৮ তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী
রংপুরে ২৮ জন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতা ও দীর্ঘদিনের বৈষম্য পেরিয়ে তাদের এই অংশগ্রহণকে শিক্ষা ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষার্থী সকল তৃতীয় লিঙ্গের বয়স ২৮ থেকে ৪০ বছর।
শুক্রবার সকাল ৯টায় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শুরু হওয়া এসএসসি প্রোগ্রাম-২০২৬ পরীক্ষায় তারা অংশ নেন। টানা তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ শেষে শিক্ষার্থীরা জানান, বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এ পর্যায়ে পৌঁছানো তাদের জন্য গর্ব, আত্মমর্যাদা ও নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।
তৃতীয় লিঙ্গের পরীক্ষার্থীরা জানান, সরকারের দেওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন এবং ভালো ফলাফলের ব্যাপারে আশাবাদী। তাদের অনেকে ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, চাকরি করা কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
তারা জানান, তাদের গুরু মা আনোয়ারা ইসলাম রানী তাদেরকে পড়ামুনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং হাতে-কলমে পড়াশুনা শিখিয়েছেন। তারা গুরু মায়ের সাথে একইসঙ্গে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। তাদের গহুরু মা আনোয়ারা ইসলাম রানী তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের মুলস্রোতে রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সহযোগিতা করছেন।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে তাদের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির পথ ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়েছে। এবারের এই অংশগ্রহণ সেই ইতিবাচক পরিবর্তনেরই বাস্তব প্রতিফলন।
আনোয়ারা ইসলাম রানীর বাড়ী রংপুর নগরের আলমনগর নুরপুর এলাকায়। ৩৩ বছর বয়সি রানী স্কুলে পড়াশুনা করার সুযোগ পেলেও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি।
এবছর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালিয়ের অধীন এবছর এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন। তিনি কম্পিউটারসহ আইটিতে দক্ষ। তিনি তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির অধিকার নিয়ে কাজ করেন। রংপুরে দুদফায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহন করে প্রতিদ্বন্দিতা করেছেন এবং জনগনের আস্থাভাজন হয়েছেন। রংপুর নগরীতে সকল ধরনের সামাজিক কর্মকান্ডে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন।
পরীক্ষার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, “এটি শুধু একটি পরীক্ষা নয়, আমাদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি। আমরা দীর্ঘদিন অবহেলা ও উপেক্ষার শিকার হয়েছি। এখন পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছি- এটাই আমাদের বড় শক্তি। আমরা শিক্ষিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই, সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই।”
তিনি বলেন,’ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে শুধু আমি নিজে ভালো থাকলে এটাকে ভালো বলা যাবে না। সমাজের সকল তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে ভালো রাখতে হবে। এজন্য তাদেরকে শিক্ষিত হতে হবে। আমি চেষ্টা করেছি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলোকে শিক্ষিত করার। এখনো চেষ্টা করছি।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেন্জু বলেন, “শিক্ষা সবার মৌলিক অধিকার—এই সত্যকে সামনে এনে রংপুরের তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীরা নতুন ইতিহাস গড়েছে। তাদের অদম্য প্রচেষ্টা, সাহস, মনোবল এবং প্রতিকূলতা জয় করে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা সমাজের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।”
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় সুত্র জানায়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক ৯টি কেন্দ্রে মোট ১ হাজার ১৩২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে ২৮ জন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছেন। এই কেন্দ্রে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫৯ জন।
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুলভিত্তিক এসএসসি প্রোগ্রামে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধা চালু করা হয়েছে। তাদের কোর্স ফি’র ৬০ শতাংশ মওকুফ করা হয়েছে, যা শিক্ষার সুযোগ আরও সহজ ও সহজলভ্য করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের সহায়তা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে।
পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মাহেদুল আলম বলেন, “একসঙ্গে ২৮ জন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ সত্যিই ব্যতিক্রমী ঘটনা। আমরা তাদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করেছি, যাতে তারা কোনো সংকোচ ছাড়াই পরীক্ষা দিতে পারেন।”
রংপুরে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক আবু হাফিজ মো. ফজলে নিজামি জানান, তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীরা যেন কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার না হন, সেজন্য কেন্দ্রগুলোতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, “শিক্ষা সবার মৌলিক অধিকার। লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে কেউ যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।”
তিনি আরও বলেন, “এই উদ্যোগ শুধু পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজে সমতা, সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।”
রংপুরের এই ২৮ শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথে আশাব্যঞ্জক বার্তা- যেখানে শিক্ষা হবে সবার জন্য সমান অধিকার,’ তিনি বলেন।
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ


























