ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে কুড়িগ্রাম দিশেহারা: ৮৫০ কোটি টাকার তীর সংরক্ষণ প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়
- আপডেট সময় : ০৭:১৯:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬ ২৪৯৭৪ বার পড়া হয়েছে
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে কুড়িগ্রাম দিশেহারা: ৮৫০ কোটি টাকার তীর সংরক্ষণ প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে কুড়িগ্রাম দিশেহারা: ৮৫০ কোটি টাকার তীর সংরক্ষণ প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়।
বছরের পর বছর ধরে ব্রহ্মপুত্রের অব্যাহত ভাঙনে উত্তরাঞ্চলের জেলা কুড়িগ্রামে তৈরি হয়েছে এক নীরব মানবিক বিপর্যয়। নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা জনপদগুলো যেন প্রতিনিয়ত বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়—ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করেই টিকে আছে হাজারো পরিবার।
ভারতের আসাম থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্র নদ নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর ইউনিয়ন দিয়ে দেশে প্রবেশ করে কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও চর রাজিবপুর অতিক্রম করে গাইবান্ধা ও জামালপুরের বাহাদুরাবাদে গিয়ে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়। তবে এই নদীর আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপই যেন বেশি অনুভব করছে কুড়িগ্রামের মানুষ।
পড়ুন>> আলমখালী ফসল রক্ষা বাঁধ পরিদর্শনে এমপি কামরুল
স্থানীয়দের মতে, নারায়ণপুর থেকে রাজিবপুর পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকায় গত সাত দশকের বেশি সময় ধরে চলমান ভাঙনে বদলে গেছে পুরো অঞ্চলের চিত্র। এক সময়ের বসতভিটা এখন নদীর তলদেশ, ফসলি জমি পরিণত হয়েছে পানির নিচে। বহু গ্রাম, হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা হারিয়ে গেছে নদীগর্ভে।
এই ভাঙনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনে। কয়েক লক্ষ মানুষ একাধিকবার ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কেউ আশ্রয় নিয়েছে বাঁধের ওপর, কেউবা অন্যের জমিতে। অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্য যেন তাদের নিত্যসঙ্গী।
ভাঙনকবলিত উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল ওহাহেদ বলেন, “ছয়বার ঘর বানাইছি, ছয়বারই নদীতে গেছে। এখন কোথায় থাকব, কী করব—কিছুই বুঝি না।”
পড়ুন>> ভুয়া এসআই পরিচয়ে থানায় প্রতারণার চেষ্টা করতে ধরা খেলেন যুবক
একই এলাকার রমিজা খাতুনের কণ্ঠে হতাশা, “নদী আমার সবকিছু নিয়ে গেছে। এখন অন্যের জমিতে থাকি। বর্ষা এলেই মনে হয় আবার সব শেষ হয়ে যাবে।”
রৌমারীর ফুলুয়ার চর এলাকার কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, “আমার ১০ বিঘা জমি নদী খাইয়া ফেলছে। এখন দিনমজুরি করে বাঁচি।”
চর রাজিবপুরের জাহিদা খাতুন জানান, “বারবার ঘর হারিয়ে আর টিকে থাকা সম্ভব না। এখন যদি ব্যবস্থা না নেয়, আমরা পথে বসব।”
নদীভাঙনের কারণে শুধু মানুষই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জেলার অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো। হাজার হাজার একর আবাদি জমি বিলীন হওয়ায় কৃষি উৎপাদন কমে গেছে, বাড়ছে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য।
আরও পড়ুন>> রাণীশংকৈলে ফেসবুকে মহানবী (সা:) নিয়ে কটুক্তি করায় যুবক গ্রেপ্তার
এ পরিস্থিতিতে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ব্রহ্মপুত্র নদের বাম তীর সংরক্ষণে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বৃহৎ প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। রৌমারী, রাজিবপুর ও উলিপুর উপজেলার প্রায় ১৬ দশমিক ৩০৫ কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধের পরিকল্পনা রয়েছে এতে।
প্রকল্পের আওতায় সাহেবের আলগা, হবিগঞ্জ বাজার, নামাজের চর, সোনাপুর, ঘুঘুমারি, সুখের বাতি, ফুলুয়ার চরঘাটসহ একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত।
পাউবো সূত্র জানায়, প্রয়োজনীয় কারিগরি সমীক্ষা শেষে প্রকল্পটি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং পরে তা পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হয়। বর্তমানে এটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
আরও পড়ুন>> বাসন্তী পূজার আরাধনায় মেতে উঠেছে নওগাঁর সনাতন ধর্মাবলম্বীরা
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। সাহেবের আলগা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোজাফফর হোসেন বলেন, “একই পরিবার পাঁচ-ছয়বার পর্যন্ত স্থান পরিবর্তন করেছে। দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ জরুরি।”
রৌমারীর বন্দবের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের বলেন, “ফুলুয়ার চর সবচেয়ে ঝুঁকিতে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে এলাকা ছেড়ে গেছে।”
কোদালকাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির জানান, “আগামী বন্যার আগে ব্যবস্থা না নিলে শত শত পরিবার গৃহহীন হবে।”
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন সংস্থার সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “ব্রহ্মপুত্র অত্যন্ত অস্থির নদী। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ মিটার তীর ভাঙছে। শুধু তীর সংরক্ষণ নয়, নদীর নাব্যতা বজায় রাখতে নিয়মিত ড্রেজিংও জরুরি।”
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। অনুমোদন পেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু ভাঙন রোধই নয়, কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
তবে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা এই প্রকল্প কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেবে, আর ততদিনে ভাঙন আর কতটা গ্রাস করবে কুড়িগ্রামকে।
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ


























