দিনাজপুরের হাকিমপুর (হিলি) থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ-বাণিজ্য, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, পুলিশ বিভিন্ন সময় তাদের আটক করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেছে এবং টাকা দিতে ব্যর্থ হলে নিরীহ ব্যক্তিদের ডাকাতি, মাদক ও অপহরণের মতো মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগীরা সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।
হাকিমপুর পৌরসভার উত্তর বাসুদেবপুর এলাকার মৃত গিয়াস উদ্দিনের স্ত্রী দুলালী বেগম অভিযোগ করেন, গত ১৮ জুন রাতে তার বাড়িতে পুলিশ ঢুকে তার ছেলে অন্তরকে ধরে নিয়ে যায়। দুলালী বেগম জানান, ছেলেকে ছাড়ানোর জন্য থানায় গেলে ওসি জাকির হোসেন তার কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে না পারায় পরদিন সকালে তার ছেলেকে ডাকাতি মামলায় জড়িয়ে দিনাজপুর কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমার স্বামী নেই। আমি বিধবা নারী। এত টাকা কোথায় পাব? টাকা দিতে না পারায় আমার ছেলেকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। আমি সুষ্ঠু বিচার চাই।”
পাঁচবিবি উপজেলার ভীমপুর গ্রামের মুন্নী আক্তার অভিযোগ করেন, গত ২৪ জুলাই অটোযোগে ফেরার পথে সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে এসআই ফারুক, এসআই দিপু ও এএসআই মোসলেম তার কাছে টাকা দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় তাকে মাদক মামলায় ফাঁসানো হয়। মুন্নী জানান, ওসি তাকে একজন মাদক কারবারির সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, “পুলিশের কারণে আমি আজ নিঃস্ব। আমার স্বামীও আমার কাছে আসছেন না, কোনো খরচ দিচ্ছেন না। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
বিরামপুরের ব্যবসায়ী মুকুল হোসেন জানান, গত ১ জুলাই হিলি চারমাথা এলাকায় ব্যাংকে টাকা তুলতে গিয়ে তিনি পুলিশের কবলে পড়েন। কোনো কারণ ছাড়াই তাকে থানায় নিয়ে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরদিন আদালতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তার বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা দেওয়া হয়েছে। মুকুল বলেন, “আমার বক্তব্য না শুনে এভাবে মামলা দেওয়া পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার। জামিনে বের হলেও এখন মানুষের কাছে মুখ দেখাতে পারছি না।”
ইটা বাউনা এলাকার আতিয়ার রহমান জানান, গ্রামে খড়ের পালায় আগুন লাগলে তিনি তা নেভাতে সাহায্য করেছিলেন। পরে জানতে পারেন, তাকে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মামলায় জড়ানো হয়েছে। থানায় গিয়ে ওসির কাছে নিজের নির্দোষিতার কথা জানালে তাকে অপমান-অপদস্ত করা হয়। আতিয়ারের অভিযোগ, তাকে সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে হাকিমপুর থানার ওসি জাকির হোসেন বলেন, “পুলিশ কখনো মিথ্যা মামলা দিয়ে জনসাধারণকে হয়রানি করে না। যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে অবশ্যই তারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। তাদের মামলার তদন্ত আরও করা হবে, পরে বিষয়গুলো আপনারা ক্লিয়ার জানতে পারবেন।”
হাকিমপুর-ঘোড়াঘাট সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আ. ন. ম. নিয়ামত উল্লাহ বলেন, “আমার কাছে এখনো কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করেনি। যদি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো নির্দেশ দেন, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।”
দিনাজপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন জানান, দুলালী বেগম নামের একজনের লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, “তাকে হাকিমপুর সার্কেলের কাছে বিষয়টি অবগত করতে বলা হয়েছে। অন্যান্য অভিযোগকারীদের সঙ্গেও কথা বলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ প্রশাসন তদন্তের আশ্বাস দিলেও স্থানীয়ভাবে এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করার এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া জরুরি। ভুক্তভোগীরা এখন ন্যায়বিচারের আশায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার ভীমপুর গ্রামের বুলবুল হোসেনের স্ত্রী মুন্নী আক্তার অভিযোগ করেন, গত ২৪ জুলাই দুপুরে হাকিমপুর থেকে অটোযোগে বাড়ি ফেরার পথে সাদা পোশাকে দুই পুলিশ সদস্য তাকে আটক করে হাকিমপুর থানা এলাকায় নিয়ে যান।
মুন্নীর অভিযোগ, ওই অভিযানের পর তার সামনে ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার পর ওই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ।
পরে স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে গাঁজা উদ্ধার করে।
এরপর তাকে থানায় নিয়ে গাঁজা দিয়ে মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়।
পরে তাকে দিয়ে ওসির কাছে ২৫ গ্রাম গাঁজা পাওয়ার কথা বলানো হয়।
পরদিন সকালে ৫০ গ্রাম গাঁজাসহ আদালতে পাঠানো হয় বলে দাবি করেন তিনি।
একইসঙ্গে এক সাংবাদিকের কাছে মাদকসহ স্বামী-স্ত্রী আটকের তথ্য দেওয়া হয়।
পরে জামিনে বাড়ি ফিরে তিনি জানতে পারেন, তার স্বামীও বিষয়টি নিয়ে ভুল ধারণা করে তার কাছ থেকে দূরে সরে গেছেন।
ব্যাংকে টাকা না থাকায় সেখানে আরো কয়েকজনের সঙ্গে বসে অপেক্ষা করছিলেন।
এ সময় সাদা পোশাকে কয়েকজন পুলিশ এসে প্রথমে একজনকে এবং পরে তাকেসহ আরো একজনকে থানায় যেতে বলেন।
সূত্র: Risingbd
Leave a Reply