দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার এবং প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে মাথাপিছু গড় আয় ৪ হাজার ৫৯১ মার্কিন ডলারে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ‘ট্রান্সফর্মিং ইকোনমি ফ্রম ফ্র্যাজিলিটি টু প্রসপারিটি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৬–২৭ থেকে ২০৩০–৩১ অর্থবছর পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বুধবার (১৯ আগস্ট) এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
জিইডির তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের মাথাপিছু গড় আয় ছিল ২ হাজার ৯৫৮ ডলার। সেই হিসেবে পাঁচ বছরের এই পরিকল্পনা শেষে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬৩৩ ডলার বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, মাথাপিছু আয় মানেই ব্যক্তির একক আয় নয়; বরং জাতীয় আয়কে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে এই গড় হিসাব করা হয়।
সরকারের এই অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনাটি তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত। প্রথম বছরকে পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার বছর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সবশেষে, তৃতীয় থেকে পঞ্চম বছরকে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার পর্যায় হিসেবে ধরা হয়েছে, যেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বর্তমান অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে জিইডি। ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ২০৩০–৩১ অর্থবছরে ৫ শতাংশের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হলেও, পরবর্তী বছরগুলোতে তা ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে ২০৩০–৩১ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এছাড়া ২০৩০–৩১ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় প্রথম বছরে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক, খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পরবর্তী ধাপে ব্যাংকের সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাজস্ব খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে রাজস্ব নীতি ও আদায় বিভাগকে আলাদা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি একক ভ্যাট হার চালু, করছাড় হ্রাস, ছোট ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনা এবং পুরো কর প্রদানব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রয়েছে।
যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নেও বড় ধরনের বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ–কুমিল্লা–লাকসাম–ফেনী কর্ডলাইন নির্মাণ, ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীতকরণ ও বিদ্যুতায়ন এবং ঢাকা–পঞ্চগড় ও ঢাকা–চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেলপথ ডাবল লাইন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া ঢাকা থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বড় শহরগুলোতে মেট্রোরেল, এলিভেটেড রেল ও মনোরেল চালুর পরিকল্পনাও এই প্রতিবেদনের অন্তর্ভুক্ত।
তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ৫৬০ জন তরুণকে স্টার্টআপ ফান্ড থেকে অর্থায়ন এবং ১ হাজার ২০০ নারী উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিশেষে, অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল ভিত্তি হিসেবে সুশাসনকে চিহ্নিত করেছে জিইডি। সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। রা//বি
Leave a Reply