রাজধানীজুড়ে গ্যাসের তীব্র সংকট জনজীবনে স্থবিরতা তৈরি করেছে। সিএনজি অটোরিকশা চালক থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহিণী—সবাই এখন জ্বালানি সংকটের শিকার। ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি আর বাসাবাড়িতে চুলায় গ্যাসের চাপ না থাকায় দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
রাজধানীর রায়েবাগ ও কাজলা এলাকার সিএনজি স্টেশনগুলোতে সরেজমিনে দেখা যায়, গ্যাসের জন্য গাড়ির সারি কয়েকশ মিটার ছাড়িয়ে গেছে। অনেক চালক গভীর রাত বা ভোরে এসে লাইনে দাঁড়িয়েও দুপুর পর্যন্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। সানোয়ার নামে এক সিএনজিচালক জানান, রাত ২টায় লাইনে দাঁড়িয়েও তিনি কয়েক ঘণ্টা পর পর্যন্ত গ্যাস পাননি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এভাবে দিনের বড় সময় লাইনে কেটে গেলে সারাদিনের আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
চালকদের অভিযোগ, আগে যেখানে দিনে কয়েকবার যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে যাওয়া যেত, এখন তার বড় অংশ সময় পাম্পের লাইনে ব্যয় হচ্ছে। ইকরাম নামে আরেক চালক জানান, গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে গিয়ে কাজের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে, যা তাদের দৈনিক আয়ে বড় প্রভাব ফেলছে। কোনো কোনো দিন দুই থেকে তিনবার লাইনে দাঁড়াতে হয়, এতে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব মো. গোলাপ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়ানোর ফলে চালকদের কাজের সময় কমে গেছে। কিন্তু গাড়ির মালিকের দৈনিক জমার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই, ফলে পুরো সংকটের চাপ চালকদের ওপরই পড়ছে। রহমান নামে আরেক চালক যোগ করেন, একদিন আয় কম হলে সামলানো যায়, কিন্তু প্রতিদিনের এই ভোগান্তি সংসার চালানো কঠিন করে তুলছে।
শুধু সিএনজি চালকরাই নন, নগর পরিবহন ব্যবস্থাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সবুর নামে শ্রাবণ পরিবহনের এক বাস চালক জানান, রাস্তায় যাত্রী থাকলেও গ্যাস না থাকায় গাড়ি নিয়ে বের হওয়া যাচ্ছে না। পাম্পে আটকে থাকায় রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমছে, যার ফলে যাত্রীরাও চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে ৫০ থেকে ৬০টি পর্যন্ত গাড়ি অপেক্ষায় থাকার চিত্র নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
আবাসিক গ্রাহকদের অবস্থাও শোচনীয়। কাজলার বাসিন্দা স্যামা জানান, সকাল থেকে চুলায় গ্যাসের চাপ নেই, ফলে রান্না করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা মিতু জানান, বাসায় গ্যাস থাকলেও চাপ এতই কম যে রান্না করা যায় না, ফলে বাড়তি খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডার বা তেলের স্টোভের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
গ্যাসের এই সংকটের পেছনে কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যাকে দায়ী করা হচ্ছে, যার ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৪৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে, যেখানে দেশের গড় চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট।
শিল্পকারখানাগুলোও এই সংকটের বাইরে নয়। গ্যাসের চাপ কম থাকায় যন্ত্রপাতি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না, যা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে এবং আর্থিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। বুয়েটের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে শুধু পরিবহন নয়, মানুষের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি উৎসের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাতারাতি পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ নেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, দ্রুত গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। তবে এফএসআরইউ সচল হওয়া এবং বিদ্যমান মজুত ব্যবস্থাপনায় উন্নতির চেষ্টা চলছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও স্বীকার করেছেন যে, এই জটিলতা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয় এবং সংকট কাটাতে সময়ের প্রয়োজন।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বাফার মজুত তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। কাতার থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, শীতের সময় পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং গ্রীষ্মে জ্বালানি সরবরাহে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। ২০২৯ সালের মধ্যে দেশের বড় অর্থনীতির প্রয়োজন মেটাতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে সিএনজি ও আবাসিক খাতে সংকট থাকলেও পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ এবং পরিবহন খাতের শ্রমিকরা দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন, কারণ এই অনিশ্চয়তা তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয়ের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অনেকের ক্ষেত্রে তাও জুটছে না, ফলে গ্যাস ছাড়াই ফিরতে হচ্ছে তাদের খালি হাতে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: লাইনের গ্যাস না পাওয়ায় রান্নার চুলা জ্বলছে না, ফলে পরিবারের জন্য নির্ধারিত সময়ে খাবার প্রস্তুত করতে বিপাকে পড়ছেন গৃহিণীরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অনেকে এলপিজি সিলিন্ডারের গ্যাসে বা তেলের স্টোভেরান্না করছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোনো কোনো স্টেশনে আবার সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গ্যাস না পেয়ে গাড়ি চালাতে পারছি না।
সূত্র: রাইজিংবিডি
Leave a Reply