ঢাকা ১২:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা তৈরি পোশাক খাতের অস্থিরতার মাঝে মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা আজ মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলছে অর্থনৈতিক ও অভিবাসন ইস্যু মার্শাল আর্ট কনফেডারেশনের নেতৃত্বে নতুন অ্যাডহক কমিটি গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ: হামলায় আহত শ্রমিকের মৃত্যু, অর্ধশত কারখানায় ছুটি বার্সেলোনার জয়যাত্রা: রাফিনিয়ার জোড়া গোলে ধসে পড়ল অ্যাস্টন ভিলা সংশয় আর কৌতূহল চাকরিপ্রার্থীদের: ৫২তম বিসিএসও কি বিশেষ হতে যাচ্ছে আপাতত ইরানে নতুন কোনো হামলার পরিকল্পনা নেই: ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠাকুরগাঁওয়ে অন্তরঙ্গ ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগে স্বামী গ্রেপ্তার

রাজস্ব আয়ের ঘাটতি মেটাতে নতুন ঋণের খোঁজে সরকার

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:১০:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪৮ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশের সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে থাকা বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা দূর করতে ঋণের ওপর নির্ভরতা ক্রমাগত বাড়ছে। যদিও পরিকল্পনা ছিল রাজস্ব আয় বাড়িয়ে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে আনা হবে, তবে বাস্তব ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতায় তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অর্থবছরের শুরু থেকেই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে বাড়তি ঋণ নিতে হচ্ছে। এখন ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমাতে সরকার বিকল্প অর্থায়নের নতুন সব পথ খুঁজে বের করার উদ্যোগ নিয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই আশঙ্কা থেকেই সরকার এখন আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু এবং অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সুকুক বা ইসলামী বন্ড ছাড়ার কথা ভাবছে। এছাড়া বহুপক্ষীয় সংস্থাগুচ্ছ থেকে বাজেট সহায়তা, স্বল্পমেয়াদি সার্বভৌম সুকুক, অভ্যন্তরীণ ট্রেজারি বন্ডের বিপরীতে বন্ধকি ঋণ, এমনকি সবুজ ও নীল বন্ডের মতো নতুন সব আর্থিক হাতিয়ার ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সরকার সব মিলিয়ে ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি উৎস থেকে এসেছে ৫৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা এসেছে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র থেকে। উল্লেখ্য, সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নিতে হয়েছে।

চলতি বছরের জুলাই মাসে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনা যাচাই এবং কৌশল নির্ধারণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গণিকে প্রধান করে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চীন, জাপান, হংকং ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার বিষয়ে সরকার কাজ করছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বন্ড ইস্যুর এই পরিকল্পনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পূর্ণ সম্মতি রয়েছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বন্ড কার্যক্রমের সাথে যুক্ত সূত্রগুলো জানিয়েছে, চীনের বাজারে ইউয়ানের বিপরীতে ‘পান্ডা বন্ড’, জাপানের ইয়েনের বিপরীতে ‘সামুরাই বন্ড’, হংকংয়ের বাজারে ‘ডিমসাম বন্ড’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডলারভিত্তিক বন্ড ছাড়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে জেপি মরগান ও এইচএসবিসির মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ সহায়তা নেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে বিষয়টির ঝুঁকি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে আইএমএফ-এর মূল্যায়নে বাংলাদেশের ঋণ টেকসইতার অবস্থান ‘নিম্ন ঝুঁকি’ থেকে ‘মধ্যম ঝুঁকি’তে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালে মুডিস ও এসঅ্যান্ডপি বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়ে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ইস্যু করলে এর ঝুঁকি ও খরচ দুই-ই অনেক বেশি। শ্রীলঙ্কার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ডের দায়বদ্ধতার বড় ভূমিকা ছিল, যেখানে স্বল্পমেয়াদি বন্ডের অর্থ একসাথে পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছিল। তিনি আরও যোগ করেন, আন্তর্জাতিক বন্ড বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা দ্বিপক্ষীয় ঋণের চেয়ে ব্যয়বহুল এবং এতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পাওয়া কঠিন। এটি রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর-এর কর আহরণের কোনো বিকল্প হতে পারে না। তাই অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী উন্নয়ন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, যিনি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক, তিনি ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার আর্থিক সংকটের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তার মতে, বৈদেশিক মুদ্রায় উচ্চ সুদের বন্ড অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বন্ডের সফলতা সম্পূর্ণভাবে এর গঠনকাঠামো ও বিনিয়োগকারী কারা তার ওপর নির্ভর করবে।

বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংক ঋণের বিকল্প হিসেবে সুকুক বা ইসলামী বন্ডের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছে সরকার। ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার সুকুক ইস্যু করা হয়েছে। আগে এই বন্ডগুলো অ-বিক্রয়যোগ্য থাকলেও সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকগুলোর অনুকূলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিক্রয়যোগ্য সুকুক ইস্যু করা হয়েছে। সরকার এখন ভবিষ্যতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিক্রয়যোগ্য সুকুক ইস্যু করার বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সরকার বেশ কিছু সাফল্য পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি ১৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা অনুমোদন করেছে, যার একটি অংশ বিদ্যমান ১২টি প্রকল্পের অব্যবহৃত ঋণ থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়াও সার ও খাদ্য আমদানিতে ৩০ কোটি ডলার এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট নিরসনে ৪০ কোটি ডলার সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর সাথে ১৪০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। একই সঙ্গে এডিবির ৫ বিলিয়ন ডলারের ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পের আওতায় প্রতিবছর অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলার ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

পরিশেষে, নীতিনির্ধারকদের মতে, বিকল্প উৎসের এই প্রচেষ্টা মূলত ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমানোর একটি কৌশল। তবে শেষ পর্যন্ত এসবই ঋণ, তাই সরকারের মূল মনোযোগ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর দিকেই থাকা উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কমিটি তাদের পর্যালোচনা প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জাপানি মুদ্রা ইয়েনে ইস্যু করা বৈদেশিক বন্ডকে সামুরাই বন্ড বলা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চারটি বাজারে কোন ধরনের বন্ড কত পরিমাণে এবং কী শর্তে ছাড়া হবে, তা পরবর্তী পর্যায়ে চূড়ান্ত করা হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত ২০ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর প্রস্তুতি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: খায়েরুজ্জামান মজুমদার জানান, অতীতে ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অর্থ বিভাগ সার্বভৌম বন্ড ইস্যুতে আগ্রহী ছিল না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্মিত ও নির্মাণাধীন সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর বিপরীতে বড় অঙ্কের সুকুক ইস্যুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

রাজস্ব আয়ের ঘাটতি মেটাতে নতুন ঋণের খোঁজে সরকার

আপডেট সময় : ১২:১০:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশের সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে থাকা বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা দূর করতে ঋণের ওপর নির্ভরতা ক্রমাগত বাড়ছে। যদিও পরিকল্পনা ছিল রাজস্ব আয় বাড়িয়ে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে আনা হবে, তবে বাস্তব ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতায় তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অর্থবছরের শুরু থেকেই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে বাড়তি ঋণ নিতে হচ্ছে। এখন ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমাতে সরকার বিকল্প অর্থায়নের নতুন সব পথ খুঁজে বের করার উদ্যোগ নিয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই আশঙ্কা থেকেই সরকার এখন আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু এবং অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সুকুক বা ইসলামী বন্ড ছাড়ার কথা ভাবছে। এছাড়া বহুপক্ষীয় সংস্থাগুচ্ছ থেকে বাজেট সহায়তা, স্বল্পমেয়াদি সার্বভৌম সুকুক, অভ্যন্তরীণ ট্রেজারি বন্ডের বিপরীতে বন্ধকি ঋণ, এমনকি সবুজ ও নীল বন্ডের মতো নতুন সব আর্থিক হাতিয়ার ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সরকার সব মিলিয়ে ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি উৎস থেকে এসেছে ৫৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা এসেছে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র থেকে। উল্লেখ্য, সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নিতে হয়েছে।

চলতি বছরের জুলাই মাসে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনা যাচাই এবং কৌশল নির্ধারণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গণিকে প্রধান করে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চীন, জাপান, হংকং ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার বিষয়ে সরকার কাজ করছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বন্ড ইস্যুর এই পরিকল্পনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পূর্ণ সম্মতি রয়েছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বন্ড কার্যক্রমের সাথে যুক্ত সূত্রগুলো জানিয়েছে, চীনের বাজারে ইউয়ানের বিপরীতে ‘পান্ডা বন্ড’, জাপানের ইয়েনের বিপরীতে ‘সামুরাই বন্ড’, হংকংয়ের বাজারে ‘ডিমসাম বন্ড’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডলারভিত্তিক বন্ড ছাড়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে জেপি মরগান ও এইচএসবিসির মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ সহায়তা নেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে বিষয়টির ঝুঁকি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে আইএমএফ-এর মূল্যায়নে বাংলাদেশের ঋণ টেকসইতার অবস্থান ‘নিম্ন ঝুঁকি’ থেকে ‘মধ্যম ঝুঁকি’তে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালে মুডিস ও এসঅ্যান্ডপি বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়ে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ইস্যু করলে এর ঝুঁকি ও খরচ দুই-ই অনেক বেশি। শ্রীলঙ্কার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ডের দায়বদ্ধতার বড় ভূমিকা ছিল, যেখানে স্বল্পমেয়াদি বন্ডের অর্থ একসাথে পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছিল। তিনি আরও যোগ করেন, আন্তর্জাতিক বন্ড বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা দ্বিপক্ষীয় ঋণের চেয়ে ব্যয়বহুল এবং এতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পাওয়া কঠিন। এটি রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর-এর কর আহরণের কোনো বিকল্প হতে পারে না। তাই অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী উন্নয়ন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, যিনি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক, তিনি ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার আর্থিক সংকটের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তার মতে, বৈদেশিক মুদ্রায় উচ্চ সুদের বন্ড অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বন্ডের সফলতা সম্পূর্ণভাবে এর গঠনকাঠামো ও বিনিয়োগকারী কারা তার ওপর নির্ভর করবে।

বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংক ঋণের বিকল্প হিসেবে সুকুক বা ইসলামী বন্ডের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছে সরকার। ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার সুকুক ইস্যু করা হয়েছে। আগে এই বন্ডগুলো অ-বিক্রয়যোগ্য থাকলেও সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকগুলোর অনুকূলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিক্রয়যোগ্য সুকুক ইস্যু করা হয়েছে। সরকার এখন ভবিষ্যতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিক্রয়যোগ্য সুকুক ইস্যু করার বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সরকার বেশ কিছু সাফল্য পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি ১৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা অনুমোদন করেছে, যার একটি অংশ বিদ্যমান ১২টি প্রকল্পের অব্যবহৃত ঋণ থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়াও সার ও খাদ্য আমদানিতে ৩০ কোটি ডলার এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট নিরসনে ৪০ কোটি ডলার সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর সাথে ১৪০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। একই সঙ্গে এডিবির ৫ বিলিয়ন ডলারের ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পের আওতায় প্রতিবছর অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলার ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

পরিশেষে, নীতিনির্ধারকদের মতে, বিকল্প উৎসের এই প্রচেষ্টা মূলত ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমানোর একটি কৌশল। তবে শেষ পর্যন্ত এসবই ঋণ, তাই সরকারের মূল মনোযোগ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর দিকেই থাকা উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কমিটি তাদের পর্যালোচনা প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জাপানি মুদ্রা ইয়েনে ইস্যু করা বৈদেশিক বন্ডকে সামুরাই বন্ড বলা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চারটি বাজারে কোন ধরনের বন্ড কত পরিমাণে এবং কী শর্তে ছাড়া হবে, তা পরবর্তী পর্যায়ে চূড়ান্ত করা হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত ২০ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর প্রস্তুতি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: খায়েরুজ্জামান মজুমদার জানান, অতীতে ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অর্থ বিভাগ সার্বভৌম বন্ড ইস্যুতে আগ্রহী ছিল না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্মিত ও নির্মাণাধীন সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর বিপরীতে বড় অঙ্কের সুকুক ইস্যুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Facebook Comments Box