যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন এক যুদ্ধকৌশল ঘোষণা করেছেন, যার মূল লক্ষ্য দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া। বুধবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তবে ট্রাম্পের অতীত কর্মকাণ্ডের ইতিহাস বিবেচনায় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজনৈতিক চাপ ও ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামলাতে গিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অতীতেও তিনি এমন কঠোর পদক্ষেপের কথা বলেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে ব্যর্থ হওয়া এবং পারমাণবিক আলোচনায় কোনো সুরাহা না হওয়ার পর ট্রাম্পের এই নতুন কৌশল মূলত নিজেদের মুখ রক্ষার একটি প্রচেষ্টা। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক মিত্রদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ইরানের সাথে সব ধরনের আলোচনা বন্ধ করা হয়েছে। ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থা ইরানকে কোনো ধরনের সুবিধা দেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া তেল চোরাচালান, অর্থ স্থানান্তর এবং ভুয়া কোম্পানি ও জাহাজের নিবন্ধনের মতো সমস্ত পথ অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
ইসরাইল ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্সের গবেষণা ও বিশ্লেষণ বিভাগের প্রাক্তন ইরান বিষয়ক প্রধান ড্যানিয়েল সিট্রিনোভিচ সতর্ক করে বলেছেন, তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মুখে ইরান ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা করা হবে চরম ভুল। তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর চাপ সৃষ্টির যে কৌশল তেহরান গ্রহণ করেছে, তা পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই। অর্থনৈতিক ক্ষতি সত্ত্বেও ইরানের মূল রাজনৈতিক অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ধৈর্যের প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড করপসের (আইআরজিসি) রাজস্ব এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক নিষ্ক্রিয় করতে হলে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের নিয়ে বড় ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লুদোভিক হুড পরামর্শ দিয়েছেন, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের উচিত ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা চীনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো। তবে আগামী সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে ওয়াশিংটন এমন কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের দুই মাস আগে ইরানও পাল্টা জবাব দেওয়ার সুযোগ খুঁজছে। তেহরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে নতুন ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে মার্কিন ভোটারদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ডেমোক্রেট প্রতিনিধি জেমস ওয়াকিনশ এই কৌশলের সমালোচনা করে বলেছেন, তিনি এমন কোনো অর্থনৈতিক ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে আগ্রহী নন, যার চূড়ান্ত মূল্য মার্কিন জনগণকে গ্যাস স্টেশন ও মুদি দোকানে দিতে হয়। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের এই নতুন অর্থনৈতিক যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান আনবে, নাকি রাজনৈতিক চাপে তিনি পিছু হটবেন, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: মানবজমিন
Leave a Reply