বিশ্বের ৯৬ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্র সংকটের মুখে
- আপডেট সময় : ০৬:৩১:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
সমুদ্রের তলদেশের জীববৈচিত্র্যের আধারখ্যাত প্রবালপ্রাচীরগুলো এখন গভীর সংকটের সম্মুখীন। মো. শফিউল্লাহ, নোবিপ্রবি প্রতিনিধি ||। সংকটের ভয়াবহতা বোঝার পাশাপাশি এই পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) একটি সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্বের ১২৭টি অগভীর পানির প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে ১২২টিই, অর্থাৎ প্রায় ৯৬ শতাংশ, অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
২২ অক্টোবর প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি প্রবালপ্রাচীর নিয়ে ‘রেড লিস্ট অব ইকোসিস্টেমস’ কাঠামোর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক মূল্যায়ন হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
ঝুঁকির এই উচ্চ হারের অর্থ এই নয় যে বিশ্বের ৯৬ শতাংশ প্রবাল ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে এর মাধ্যমে একটি সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে যে, বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতি ও পরিবেশগত ধারা অব্যাহত থাকলে এই বাস্তুতন্ত্রগুলো অদূর ভবিষ্যতে পুরোপুরি ধসে পড়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। বৈজ্ঞানিক এই মূল্যায়নে অতীতের প্রায় ৫০ বছরের পরিবেশগত পরিবর্তনের তথ্যের পাশাপাশি ভবিষ্যতের তাপীয় চাপের পূর্বাভাসও যুক্ত করা হয়েছে। ব্লিচিংয়ের সময় প্রবাল সাদা দেখালেও তার মানে এই নয় যে এটি সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেছে।
গবেষকদের তথ্যমতে, বৈশ্বিক জলবায়ুর যে মধ্যমপন্থি পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছে, তাতে শিল্পায়ন-পূর্ব সময়ের তুলনায় ২১০০ সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে। এই পূর্বাভাসকে মাথায় রেখে ২০২৬ থেকে ২০৭৫ সাল পর্যন্ত তাপীয় চাপ বিশ্লেষণ করে ১২১টি অঞ্চলকে সর্বোচ্চ ঝুঁকির শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির সূচক বিবেচনায় নিলে মোট ১২২টি অঞ্চল ‘ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড’ বা সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, যদি কেবল অতীতের তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হতো, তবে ১২৭টির মধ্যে মাত্র ৩০টি অর্থাৎ ২৪ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর অঞ্চল এই চরম ঝুঁকির শ্রেণিতে পড়ত। ভবিষ্যতের জলবায়ু মডেল যুক্ত হওয়ায় ঝুঁকির মাত্রা যে অনেক বেশি ভয়াবহ, তা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রবালপ্রাচীরকে অনেক সময় ‘সমুদ্রের রেইনফরেস্ট’ বলা হয়ে থাকে। এর কারণ হলো অত্যন্ত সীমিত বিস্তৃতির এই এলাকাগুলো বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য, আশ্রয় ও প্রজননের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। প্রবাল পলিপ নামক ক্ষুদ্র প্রাণীদের দ্বারা নির্মিত এই কাঠামো উপকূলীয় জনবসতিকেও ঝড়ের আঘাত ও ঢেউয়ের তীব্রতা থেকে রক্ষা করে এবং অর্থনৈতিক ও জীবনযাত্রার মান নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই ছোট এলাকাতেই আশ্রয় নেয় বিপুলসংখ্যক সামুদ্রিক প্রাণী।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এই বাস্তুতন্ত্রের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবালের সাথে বসবাসকারী আলোকসংশ্লেষণকারী শৈবাল তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বেরিয়ে যায়, যাকে ‘কোরাল ব্লিচিং’ বলা হয়। বারবার সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের কবলে পড়লে প্রবালের পুনরুদ্ধার ক্ষমতা কমে যায় এবং মৃত্যুহার বেড়ে যায়। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তি বাড়তে থাকায় প্রবাল স্বাভাবিক পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা হারাচ্ছে। অনুকূল পরিবেশ ফিরে এলে কিছু প্রবাল পুনরুদ্ধার করতে পারে।
আইইউসিএনের এই মূল্যায়নে শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, স্থানীয় নানা চাপকেও প্রবাল ধ্বংসের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রায় ৬৩ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর অঞ্চলে মাছ ও অন্যান্য জীবের পারস্পরিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। অতিরিক্ত মাছ আহরণের ফলে প্যারটফিশের মতো মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় শৈবাল নিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে প্রবালের বংশবিস্তার ও পুনরুদ্ধারের পথ কঠিন করে তুলছে।
এছাড়া উপকূলীয় অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন প্রবালপ্রাচীরের স্বাস্থ্যকে দিন দিন দুর্বল করে দিচ্ছে। কৃষি ও নগর এলাকার বর্জ্য সরাসরি সমুদ্রের পানিতে মেশার ফলে প্রবালগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে দূষণ রোধ এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়া এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা অসম্ভব।
পরিশেষে, এই মূল্যায়ন কেবল অতীতের অবক্ষয়ের পরিসংখ্যান নয়, বরং ভবিষ্যতের করণীয় ঠিক করার একটি জরুরি দলিল। যদিও জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাস পরিবর্তনযোগ্য, তবুও বর্তমান প্রবণতা যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাস্তুতন্ত্রের এই ধস কেবল সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষতি নয়, বরং তা মানুষের জীবন ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য বড় ধরনের হুমকির ইঙ্গিত বহন করে। তাই প্রবালপ্রাচীরের অবক্ষয় কেবল সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষতি নয়; এটি এমন একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়া, যার সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য, মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সূত্র: রাইজিংবিডি

























