সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। এটি কেবল স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস নয়, বরং মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও পরিযায়ী পাখির এক অনন্য আবাসস্থল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হাওরের বিভিন্ন বিল ও খালে পলি জমে পানির গভীরতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এতে হাওরের পানিধারণ ক্ষমতা হ্রাসের পাশাপাশি নৌযান চলাচল, মাছের বিচরণক্ষেত্র ও সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে ‘টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি সম্পদের সঠিক ব্যবহার’ শীর্ষক একটি পরামর্শ সভা ও কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় বিদ্যমান বিভিন্ন সংকট ও করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
স্থানীয় জেলে ও হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে হাওরের বিভিন্ন অংশে পলি জমার হার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে রোয়া বিলসহ বেশ কিছু জলাধারে পলি জমে তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানির গভীরতা কমে গেছে। বর্ষা মৌসুম শেষে পানি নেমে যাওয়ার পর এই পরিস্থিতির প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জেলেরা জানান, আগে যেসব গভীর এলাকায় বড় মাছ পাওয়া যেত, এখন পলি জমার কারণে সেসব স্থান ভরাট হয়ে মাছের নিরাপদ আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
সিল্টেশনের কারণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে। অনেকে মনে করছেন, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় বোমা মেরে পাথর উত্তোলনের ফলে পাহাড় ও মাটির ক্ষয় হচ্ছে। সেই মাটি ও পলি পানির প্রবাহের সঙ্গে ভেসে এসে টাঙ্গুয়ার হাওরে জমা হতে পারে। যদিও এই দাবির সপক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি, তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখার দাবি উঠেছে।
সিল্টেশনের বিস্তার প্রসঙ্গে ড. ফাহমিদা খানম বলেন, হাওরের যেসব জায়গায় খনন প্রয়োজন, সেখানে ব্যাপক পলি জমেছে। তিনি জানান, গত তিন-৪ বছরে সিল্টেশন বৃদ্ধির কথা তিনি স্থানীয়দের কাছ থেকেও শুনেছেন। বিষয়টি যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে সচিব বলেন, সিল্টেশন সমস্যার সমাধানে দেশের ভেতরে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
কর্মশালায় পলি জমার পাশাপাশি হাওরের পরিবেশগত অন্যান্য সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। এর মধ্যে পর্যটনের চাপ, অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো অন্যতম। ড. ফাহমিদা খানম বলেন, এসব বিষয় হাওরের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি হাওরে হাউসবোট নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত নৌপথের ব্যবহার এবং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।
পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক শাহেদা বেগম সভায় টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের বর্তমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। সভায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা খাল-বিল খননের পাশাপাশি হাওরের পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাদের মতে, শুধু পলি অপসারণ যথেষ্ট নয়, বরং পলি কোথা থেকে আসছে এবং কোন পথে হাওরে প্রবেশ করছে, তা চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধান বের করতে হবে।
হাওরপাড়ের মানুষের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার কথা শুনে সচিব তাদের আশ্বস্ত করেন। স্থানীয়রা হাওরের পানি, মাছ, পাখি ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে, টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্প্রতি হাওর নিয়ে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায়ও পলি জমে খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও জলাধারের ধারণক্ষমতা ধরে রাখতে খাল ও বিলের নাব্য ফিরিয়ে আনা জরুরি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাদের ধারণা, পাথর উত্তোলনের সময় পাহাড় ও মাটির যে ক্ষয় হয়, সেখানকার মাটি বা পলি পানির প্রবাহের সঙ্গে বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে, সীমান্তের ওপারে পাথর উত্তোলন এবং টাঙ্গুয়ার হাওরে পলি জমার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: টাঙ্গুয়ার হাওরের জেলে আবদুর রজ্জাক বলেন, “আমার বাপ-দাদার সময় এখানে বড় বড় মাছ ধরা পড়ত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেসব জায়গায় মাছও বেশি পাওয়া যেত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে একই সঙ্গে সতর্ক মনোভাব রেখে তিনি বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে আরো যাচাই ও সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন।
সূত্র: রাইজিংবিডি
মন্তব্য করুন