চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসবেন। তার এই ঘোষণায় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও, বাস্তবে তার ফেরা কতটা সহজ হবে তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের আদালতের দৃষ্টিতে তিনি একজন পলাতক ফাঁসির আসামি।
শেখ হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আমন্ত্রণ নিয়ে আলোচনার সময় বাংলাদেশস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর কাছেও তাকে হস্তান্তরের দাবি তোলা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একই দাবি জানিয়েছে। তবে ভারত সরকার এখন পর্যন্ত কোনো সদুত্তর দেয়নি। বরং তারা বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে সরাসরি বন্দি হিসেবে দেখছে না, বরং তাকে অতিথি হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় তাকে ফেরত পাওয়া জটিল। বিষয়টি আদালতের ওপর নির্ভর করলে তা দীর্ঘমেয়াদী আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সম্প্রতি দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও বার্তার মাধ্যমে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। সেখানে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘মৃত্যুপুরী’ হিসেবে বর্ণনা করে অভিযোগ করেন যে, ৫ই আগস্ট পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, দেশে গণতন্ত্র নির্বাসনে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তবে তার এই অভিযোগের বিপরীতে বর্তমান সরকার দেশ পুনর্গঠনের কাজ করছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনার এই অডিও বার্তা ও দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি করেছে। বাংলাদেশ আগেই ভারতকে তার বক্তব্য প্রচার না করার অনুরোধ জানিয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারত জানিয়েছে, তারা শেখ হাসিনার বক্তব্য সমর্থন করে না।
এদিকে, জামায়াতে ইসলামীর মতো বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ মনে করছেন, ১৪০০-এর বেশি আন্দোলনকারী নিহতের দায় শেখ হাসিনা এড়াতে পারেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দুর্নীতির মামলাও রয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান রংপুরের এক কর্মিসভায় শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণাকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, জেলখানা তার জন্য প্রস্তুত। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শেখ হাসিনার এই ঘোষণা মূলত নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখার একটি কৌশল হতে পারে। কারণ, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার দেশে ফেরা কেবল আইনি জটিলতাই নয়, বরং রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। পিলখানা ট্র্যাজেডিসহ বিভিন্ন গুরুতর মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার কারণে ডিসেম্বরে তার দেশে ফেরার সম্ভাবনাকে অনেকে ‘অলিক কল্পনা’ হিসেবে দেখছেন।
শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে’ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। তবে তার এই আহ্বানকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা নয়, বরং এটি একটি জটিল আইনি ও কূটনৈতিক গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে।
Leave a Reply