পুলিশ বাহিনীর হাতেগোনা কিছু সদস্যের অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ভার পুরো বাহিনী বহন করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। শনিবার সকালে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আয়োজিত এক মেধাবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনকারী পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের এই বৃত্তি প্রদান করা হয়।
আইজিপি বলেন, বড় ধরনের অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে যখন পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তখন তাদের লক্ষ্য করে গুজব ও মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো হয়। তিনি এ ধরনের ‘হলুদ সাংবাদিকতার’ বিরুদ্ধে প্রকৃত সাংবাদিকদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ বাহিনীতেও খারাপ লোক রয়েছে, তবে অপরাধে জড়িত সদস্যের হার এক শতাংশের চেয়েও কম—প্রায় শূন্য দশমিক সত্তর শতাংশ। এই সামান্য সংখ্যক দুর্নীতিপরায়ণ সদস্যের জন্য পুরো পুলিশ বাহিনীকে দায়ী করা অযৌক্তিক।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে পুলিশ প্রধান বলেন, কোনো সদস্য অপরাধ করলে তা সংবাদে তুলে ধরা হোক, কিন্তু ভিত্তিহীন অপবাদ দিয়ে বাহিনীর মনোবল ভাঙার চেষ্টা কাম্য নয়।
দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে বিভিন্ন খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ব্যাংকগুলো প্রায় শূন্য হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ তাদের আমানতের টাকা ফেরত পেতে হিমশিম খাচ্ছে। তাই ষড়যন্ত্র না করে সবাইকে মিলে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে হবে।
জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আইজিপি বলেন, বর্তমানে নতুন প্রজন্মের অনেকে ট্রাফিক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে অহেতুক বাহাসে জড়াচ্ছেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তিনি সতর্ক করেন, মানুষের সম্পদ থাকলেও যদি বাড়ি থেকে বের হয়ে নিরাপদে ফেরার নিশ্চয়তা না থাকে, তবে রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে যাবে।
আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানান আইজিপি। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীদের একাধিকবার আইনের আওতায় আনা হলেও আইনি ফাঁকফোকরের কারণে তাদের দীর্ঘমেয়াদে আটকে রাখা যাচ্ছে না। ফলে তারা কারাগার থেকে বেরিয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক ও ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পুলিশ প্রধান আরও বলেন, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা খুবই কম। প্রায় এক হাজার মানুষের জন্য মাত্র একজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। মাদক তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করছে উল্লেখ করে তিনি অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। অনেক সময় ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদককে ‘এনার্জি ট্যাবলেট’ বা আকর্ষণীয় নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা থেকে সন্তানদের দূরে রাখতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আইজিপি বলেন, সাময়িক কৌতূহল বা প্ররোচনায় মাদকের মরণফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। এছাড়া মোবাইল, ইন্টারনেট গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তিকেও মাদকের মতোই ক্ষতিকর হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, প্রযুক্তিকে তোমরা ব্যবহার করবে, প্রযুক্তি যেন তোমাদের ব্যবহার করতে না পারে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থায়নে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ৮০১ জন এবং এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ২৭২ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে।
এছাড়া ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ৮৪৫ জন এবং এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ১৯৫ জন শিক্ষার্থীও এই বৃত্তির আওতায় এসেছে। দুই বছরে মোট ২ হাজার ১১৩ জন মেধাবী শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পেয়েছে, যার মধ্যে শনিবার ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে ৩৬০ জনের হাতে বৃত্তির চেক তুলে দেওয়া হয়। বাকিদের বৃত্তি সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রদান করা হবে। অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেনের সভাপতিত্বে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ ও এআইজি ইসমাইল হোসেন বক্তব্য রাখেন।
Leave a Reply