কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে সদর হাসপাতাল চত্বরে বিপুল পরিমাণ ওষুধ ও ব্যবহারযোগ্য অ্যাপ্রোন পোড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (১০ আগস্ট) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে হাসপাতালের ওষুধ পোড়ানোর সময় ছাত্রদল, যুবদল ও স্থানীয় এলাকাবাসী ঘটনাটি দেখতে পেয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে খবর দেন। পরে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজিবপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল থেকে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী চিকিৎসা নিতে সদর হাসপাতালে আসেন। কিন্তু অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে তাদের হাসপাতাল থেকে ফিরে যেতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতাল চত্বরে বস্তায় বস্তায় ওষুধ পোড়ানোর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার রাতের দিকে হাসপাতাল চত্বরে ওষুধসহ বিভিন্ন সামগ্রী পোড়ানোর সময় বিষয়টি তাদের নজরে আসে। পরে ছাত্রদল, যুবদল ও এলাকাবাসীর কয়েকজন সেখানে গিয়ে বিষয়টি জানতে চান এবং স্থানীয় প্রশাসনকে খবর দেন।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন রাজিবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) সায়েকুল হাসান খান এবং রাজিবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ শাহিনুর আলম শাহিন। তারা হাসপাতাল চত্বরে গিয়ে পোড়ানো সামগ্রী এবং ঘটনার পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখেন
এ সময় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা টি এইচ ও সারোয়ার জাহানকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, ময়লা-আবর্জনা পোড়ানোর সময় হয়তো কিছু মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধও এর সঙ্গে চলে গিয়ে থাকতে পারে।
তবে এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট হননি স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন—হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট থাকলে বিপুল পরিমাণ ওষুধ কীভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে বস্তায় বস্তায় পড়ে থাকে এবং সেগুলো কেন পুড়িয়ে ফেলতে হবে?
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, দুর্গম চরাঞ্চল থেকে দরিদ্র ও অসহায় রোগীরা চিকিৎসার আশায় রাজিবপুর সদর হাসপাতালে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ায় অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয় অথবা খালি হাতে ফিরে যেতে হয়। অথচ হাসপাতাল চত্বরে বিপুল পরিমাণ ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পোড়ানোর ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক।
শুধু ওষুধ নয়, ঘটনাস্থলে ভালো অবস্থায় থাকা বেশ কিছু অ্যাপ্রোনও পোড়ানো হচ্ছিল বলে দাবি করেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আরও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টি এইচ ও সারোয়ার জাহানকে তার কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখেন বলে জানা গেছে। পরে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালের ওষুধ ব্যবস্থাপনা, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণ ও ধ্বংসের প্রক্রিয়া এবং হাসপাতালের বিভিন্ন সামগ্রী পোড়ানোর বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কী পরিমাণ ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে, সেগুলোর তালিকা কোথায়, কখন মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং সরকারি নিয়ম মেনে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরে স্থানীয় প্রশাসন ও নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় পরিস্থিতি শান্ত হলে টি এইচ ও সারোয়ার জাহান লিখিত স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। এরপর এলাকাবাসী হাসপাতাল চত্বর ত্যাগ করেন।
এ বিষয়ে রাজিবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) সায়েকুল হাসান খান জানান, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে জেলা সিভিল সার্জনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছেন এবং ঘটনাস্থলে এসে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পোড়ানো ওষুধের প্রকৃত পরিমাণ, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণ, ওষুধ ধ্বংসের প্রক্রিয়া এবং অ্যাপ্রোন পোড়ানোর বিষয়ে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে। সরকারি হাসপাতালের ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী নিয়ে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমনটাই দাবি তাদের।
এ ঘটনায় রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওষুধ ব্যবস্থাপনা ও সরকারি চিকিৎসাসামগ্রী ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা কতটা সত্য, তা পরিষ্কার হবে।
Leave a Reply