রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবারের মতো নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে আসছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার আগমন ঘিরে যেন নতুন সাজে সেজে উঠছে পুরো শহর। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ডিভাইডার ও স্থাপনাগুলোতে চলছে রঙের কাজ; কোথাও চলছে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, কোথাও সৌন্দর্যবর্ধনের প্রস্তুতি। রাষ্ট্রপতিকে বরণ করে নিতে প্রশাসনের ব্যস্ততার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর আবহ। তবে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সঙ্গে জেলার মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রেও উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-চাহিদা।
আগামী ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঠাকুরগাঁওয়ে আসার কথা রয়েছে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। সফরকে সামনে রেখে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনাগুলোকে সাজিয়ে তোলার কাজ চলছে জোরেশোরে।
শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের ডিভাইডারগুলোতে নতুন করে রঙের প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে। সড়কের পাশের বিভিন্ন স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সড়ককে আরও দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে চলছে নানা প্রস্তুতি। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের বড় মাঠে চলছে নাগরিক সংবর্ধনার মঞ্চ নির্মাণের কাজ।
রাষ্ট্রপতির সফরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও দেখা গেছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। স্থানীয় বাসিন্দা বুলবুল হোসেন বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমাদের জেলার সন্তান। রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবার তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে আসছেন—এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের বিষয়। তাকে স্বাগত জানাতে শহর সাজানো হচ্ছে, মানুষের মধ্যেও উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে।’
ব্যবসায়ী জহির ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রপতির আগমন উপলক্ষে শহরের চেহারা বদলে যাচ্ছে। রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা হচ্ছে, ডিভাইডার ও বিভিন্ন স্থাপনায় রঙ করা হচ্ছে। তবে আমরা চাই, রাষ্ট্রপতির এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিকতা বা উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বয়ে আনুক।
গত ২০ আগস্ট সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের সন্তান হওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই জেলার মানুষের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। এবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবারের মতো নিজ জেলায় আসায় সেই আনন্দ যেন আরও তীব্র হয়েছে।
তবে উৎসবের আবহের আড়ালে জেলার মানুষের প্রত্যাশার কথাও স্পষ্ট। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ দীর্ঘদিনের নানা সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রপতির সফর নতুন উদ্যোগের সূচনা করবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
শিক্ষার্থী আয়শা আক্তার বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি আমাদের জেলার মানুষ হওয়ায় আমরা গর্বিত। তার কাছে আমাদের প্রত্যাশাও অনেক। বিশেষ করে শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে তিনি ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করি।’
স্থানীয় বাসিন্দা জব্বার আলী বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্ত্রী থাকাকালে অল্প সময়ের মধ্যেই ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, বিমানবন্দর চালুসহ বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। কয়েকটির কাজও চলমান। তবে স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থায় এখনো অনেক সমস্যা রয়েছে। রাষ্ট্রপতির কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তিনি এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন এবং জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন।
রাষ্ট্রপতির প্রথম সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে নাগরিক সংবর্ধনার। আয়োজকদের দাবি, দল-মত নির্বিশেষে এতে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে। সংবর্ধনা সফল করতে দিনরাত প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাগরিক সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক ডা. মুহাম্মদ আবু খয়রুল কবির বলেন, রাষ্ট্রপতির প্রথম সফরকে ঘিরে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আনন্দ-উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে। নাগরিক সমাজের উদ্যোগে তাকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করা হয়েছে। দল-মত নির্বিশেষে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হবে বলে আশা করছি। সংবর্ধনা সফল করতে আমাদের প্রস্তুতি চলছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচিত হওয়াকে নিজেদের গর্বের বিষয় হিসেবেই দেখছেন ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ। তাদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা পেরিয়ে জেলার একজন সন্তান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হওয়া নিঃসন্দেহে ঠাকুরগাঁওবাসীর জন্য গর্বের।
এদিকে রাষ্ট্রপতির সফরকে কেন্দ্র করে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, স্থাপনা ও অনুষ্ঠানস্থলে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের সদস্যরাও ইতোমধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে এসে নিরাপত্তা প্রস্তুতি শুরু করেছেন।
পুলিশ সুপার মো. বেলাল হোসেন বলেন, রাষ্ট্রপতির ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বরের সফরকে কেন্দ্র করে জেলার বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা জোরদারের কাজ শুরু হয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বর থেকে পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানস্থল, যাতায়াতের সড়ক ও আশপাশের এলাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
সফরের প্রথম দিন রোববার রাষ্ট্রপতির বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত ও নাগরিক সংবর্ধনায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। পরদিন সোমবার ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা রয়েছে তার।
রাষ্ট্রপতির আগমনকে ঘিরে তাই ঠাকুরগাঁও এখন একদিকে উৎসবের রঙে সেজেছে, অন্যদিকে জেলার মানুষের চোখে ভাসছে উন্নয়নের নতুন স্বপ্ন। প্রিয় মাটির সন্তান রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবারের সফরে আসছেন—এই আবেগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশাগুলোও যেন তার সামনে তুলে ধরতে প্রস্তুত ঠাকুরগাঁওবাসী।
Leave a Reply