মাটির সঙ্গে যাদের নাড়ির টান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যারা নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে বেঁচে আছেন—সেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কণ্ঠে এবার উচ্চারিত হলো অধিকার ও মর্যাদার দাবি।
জীবন-জীবিকা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ও নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণসহ নানা দাবিতে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস।
রোববার (৯ আগস্ট) সকাল ১১টায় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার আদিবাসী নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিতে নানা দাবি-দাওয়া সংবলিত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে অংশ নেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। কারও পরনে ছিল নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক, কারও হাতে ছিল অধিকার আদায়ের বার্তা। তাদের সম্মিলিত পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে উপজেলার বিভিন্ন সড়ক।
আদিবাসী চেয়ারম্যান সিংরাই সরেন মানিকের সভাপতিত্বে র্যালিটি উপজেলার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা হলরুমের সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে উপজেলা হলরুমে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আল্লামা ওয়াদুদ বিন নুর আলিফ।
বক্তব্য দেন পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহসিন আলী, আল মুনতাসির মিঠু বিশ্বাস ও জেলা খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রাজেন্দ্র নাথ রায়।অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন আওলাদ, প্রকল্প কর্মকর্তা (থ্রাইভ) রাণীশংকৈল ক্লাস্টারের আরফিনা আক্তার, কবিরাজ মরমু, সুজন মরমু, জোসেফসহ ইএসডিও ও সিডিএর প্রতিনিধিরা। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার আদিবাসী পরিবারের বিপুলসংখ্যক নারী ও পুরুষ র্যালি ও আলোচনা সভায় অংশ নেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, আদিবাসীরা বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। অথচ নানা সীমাবদ্ধতা ও সুযোগের অভাবে অনেক আদিবাসী পরিবার এখনও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
তাদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা। বক্তারা আরও বলেন, উন্নয়নের মূলধারায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
আলোচনা শেষে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।পরে রাঙ্গাটুঙ্গী মাঠে আদিবাসী সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে এক প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। খেলাকে কেন্দ্র করে মাঠজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোরদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ কর্মসূচি যেন শুধু একটি দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা নয়—বরং নিজেদের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি, অধিকার ও মর্যাদার কথা সমাজের সামনে নতুন করে তুলে ধরার একটি সম্মিলিত প্রয়াস। নিজেদের ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে আরও সমঅধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় দিনটি পালন করেন রাণীশংকৈলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ।
Leave a Reply