কাউনিয়ার তিস্তার বালুচরে এখন চলছে খেত থেকে মিষ্টি কুমড়া উত্তোলনের উৎসব। কৃষক পরিবারের দম ফেলার ফুসরত নেই। কাক ডাকা ভোরে খেতে গিয়ে কুমড়া তুলে স্তুপ করছে খেতের কোনায়। ক্রেতারা দেখে শুনে কুমড়া ক্রয় করে বস্তায় ভরে ঘোড়ার গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে ডাঙ্গায়(উচ্চ স্থানে)। এখন কুমড়া তুলতে না পারলে যে কোন সময় তিস্তার পানি ঢলে ভেসে যেতে পারে কুমড়া খেত। তাই কৃষকেরা বৃষ্টি আর তিস্তার পানি বৃদ্ধি আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
কাউনিয়ার তিস্তা নদীর বালুচরে এবার মিষ্টি কুমড়ার ভালো ফলন হয়েছে। তিস্তা চরের মিষ্টি কুমড়ার স্বাদ বেশি হওয়ায় রাজধানী ঢাকার কাওরান বাজার দখল করেছে সেই সাথে খুলনা,যশোর,কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ,গাজীপুর সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় তিস্তা চরের মিষ্টি কুমড়া বাজারজাত করা হচ্ছে। খেতেই কুমড়ার কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ১৬ টাকায়। প্রতিটি কুমড়া ওজন ভেদে বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়।
সরেজমিনে কাউনিয়া উপজেলার তিস্তার চর তালুক শাহবাজ, চরগনাই, নিজপাড়া, চর ঢুষমারা,পাঞ্জরভাঙ্গা চরে গিয়ে দেখা যায় সারি সারি কুমড়া খেতে লাল হলুদ রঙ ধারন করে অপরুপ শোভা ছড়াচ্ছে। যে দিকে চোখ যায় শুধু মিষ্টি কুমড়ার খেত।
তালুকশাহ গ্রামের কুমড়া চাষী মতিয়ার রহমান জানান তিনি ১হেক্টর জমিতে ৬ শ’ কুমড়ার চারা রোপণ করে ছিলেন। ভালো ফলন ভাল দাম পেয়ে তিনি বেশ খুশি। খেতেই ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা ১২ টাকা কেজি দরে কুমড়া ক্রয় করে ট্রাক যোগে ঢাকার কাওরানবাজার নিয়ে যাচ্ছে।
একই এলাকার কুমড়া চাষী মুক্তার হোসেন বলেন, তিনি দেড় একর জমিতে ব্যাংকক-০১ব্লাকস্টোন জাতের কুমড়া চাষ করে আশাতীত ফলন পেয়েছে। দাম ও ফলন ভাল পেয়ে তিনিও বেশ খুশি।
একই চরের কৃষক গোলাম মোস্তফা বলেন বর্ষায় নদীর দু’কূল উপচিয়ে বন্যায় প্লাবিত হয়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। একই সঙ্গে ভাঙনের মুখে পড়ে বিলীন হয় ফসলি জমি বসতভিটাসহ নানা প্রতিষ্ঠান স্থাপনা। বর্ষা বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয় তিস্তা নদী। তিস্তার ধু-ধু বালুচরে ফসল ফলানো বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার হলেও পেটে দু’মুঠো ডাল ভাত জোগাতে আমরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে বালুচরে কুমড়া চাষ করে থাকি। চরাঞ্চলের বালুতে মিষ্টি কুমড়ার চাষাবাদে খরচ কম এবং ফলন বেশি হওয়ায় এই ফসলে বেশি আগ্রহী ওঠেছেন চাষিরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানাগেছে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার ১৭টি চরে ৯০ হেক্টর জমিতে কুমড়া চাষ হয়েছে। উপজেলার নদীভাঙা ৪টি ইউনিয়নের ১৭ চরে ৩২৭জন প্রান্তিক চাষি ৯০ হেক্টর বালুচরের জমিতে মিষ্টি কুমড়ার চাষ করেছে। ব্যাংকক-০১, ব্লাকস্টোন,
বারি মিষ্টি কুমড়া, বেতব্রি, সবুজ বাংলা, পাথর কুচি, বদ্দবাটি, পাতায়া-০১ জাতের কুমড়া চাষ করা হয়েছে তিস্তার বালুচরে।
১ হেক্টর জমিতে কুমড়ার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪শ’ মেট্রিকটন, প্রতি ১ হেক্টর জমিতে খরচ ধরা হয়েছে ১লাখ ৪০ হাজার টাকা, বিক্রি হবে ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা অর্থাৎ প্রতি ১ হেক্টর জমিতে কৃষকের লাভ হবে ২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। চলতি মৌসুমে কাউনিয়ার তিস্তার চরের কুমড়া বিক্রি হবে প্রায় ৪ কোটি টাকা।
অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে মিষ্টি কুমড়া রোপণ করে তা এপ্রিলের শেষে খেত থেকে তোলা শুরু হয়েছে। চাষিরা তাদের লাল হলুদ বর্ণ ধারণ করা পাকা মিষ্টি কুমড়া খেত থেকে তুলে বিক্রির জন্য খেতের কোণায়, নদী পাড়ে স্তূপ করে রেখেছে। ফড়িয়া ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এসে দরদাম করে ট্রাকযোগে তা নিয়ে যাচ্ছে।
কাউনিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া আকতার জানান, তিস্তার বালু চর এলাকায় মিষ্টি কুমড়া চাষে উপকরণ সহায়তা প্রদান শীর্ষকপ্রকল্পের আওতায় ৩২৭ জন চাষি ৯০ হেক্টর জমিতে কুমড়া চাষ করেছে। তাদের প্রশিক্ষণ, বীজ, রাসায়নিক সার প্রদানসহ পোকামাকড় দমনে নানা উপকরণ সহায়তা করা হয়েছে। এ উপজেলায় দিন দিন কুমড়া চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কুমড়া চাষ করে চাষীরা লাভবান হচ্ছে।
Leave a Reply