ঢাকা ১২:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ফেরাতে জরুরি সংস্কারের তাগিদ বিশ্বব্যাংকের

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৫২:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবিলম্বে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বুধবার প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনে সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, গত তিন বছর ধরে চলমান প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং রাজস্ব আহরণে ঘাটতির মতো সমস্যাগুলো অর্থনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে উদ্ভূত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যকর করা সম্ভব হলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বিশ্বব্যাংকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে, যা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং দ্রুত কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থনীতি আবার শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের ধারায় ফিরতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বৈশ্বিক এই ধাক্কা সামলানোর জন্য বাংলাদেশের বৈশ্বিক রিজার্ভ সুরক্ষা ও নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা সীমিত।

দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলোর চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। ২০২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৫ শতাংশে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। দারিদ্র্যের হারেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট; ২০২২ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থাকলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২১.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। সংঘাতের প্রভাব না থাকলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মাত্র ৫ লাখ মানুষ তা কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রধান অর্থনৈতিক সূচক ও সংকটের চিত্র। খাদ্যাভিগম্যতা ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।

ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের নাজুক অবস্থা সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অকার্যকর বা খেলাপি ঋণের হার (NPL Ratio) ৩০.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। অনেক ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা এতটাই কমেছে যে তাদের লোকসান সইবার ক্ষমতা হারিয়ে গেছে। একইসঙ্গে, গত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো সামাজিক সুরক্ষার খাতে বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জিন পেসমে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহনশীলতা প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করলেও রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাত ও ব্যবসার পরিবেশে সাহসী সংস্কার ছাড়া এই ধারা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে ফিরে আসতে এখনই শক্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ফেরাতে জরুরি সংস্কারের তাগিদ বিশ্বব্যাংকের

আপডেট সময় : ১২:৫২:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবিলম্বে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বুধবার প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনে সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, গত তিন বছর ধরে চলমান প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং রাজস্ব আহরণে ঘাটতির মতো সমস্যাগুলো অর্থনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে উদ্ভূত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যকর করা সম্ভব হলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বিশ্বব্যাংকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে, যা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং দ্রুত কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থনীতি আবার শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের ধারায় ফিরতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বৈশ্বিক এই ধাক্কা সামলানোর জন্য বাংলাদেশের বৈশ্বিক রিজার্ভ সুরক্ষা ও নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা সীমিত।

দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলোর চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। ২০২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৫ শতাংশে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। দারিদ্র্যের হারেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট; ২০২২ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থাকলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২১.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। সংঘাতের প্রভাব না থাকলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মাত্র ৫ লাখ মানুষ তা কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রধান অর্থনৈতিক সূচক ও সংকটের চিত্র। খাদ্যাভিগম্যতা ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।

ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের নাজুক অবস্থা সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অকার্যকর বা খেলাপি ঋণের হার (NPL Ratio) ৩০.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। অনেক ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা এতটাই কমেছে যে তাদের লোকসান সইবার ক্ষমতা হারিয়ে গেছে। একইসঙ্গে, গত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো সামাজিক সুরক্ষার খাতে বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জিন পেসমে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহনশীলতা প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করলেও রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাত ও ব্যবসার পরিবেশে সাহসী সংস্কার ছাড়া এই ধারা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে ফিরে আসতে এখনই শক্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

Facebook Comments Box