ঢাকা ০৮:০২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
টোকিওর আদলে ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন করার প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রীর সালাহউদ্দিন |: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনতেই হবে, বিকল্প নেই ভূরুঙ্গামারীতে ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে জামায়াতের বিক্ষোভ ​নাগেশ্বরীতে ২৮ অক্টোবর পল্টন ট্র্যাজেডি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত নাগেশ্বরীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত বিশ্ব হাত ধোঁয়া দিবস ডোমারে উদযাপন কাউনিয়ায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালন   কাউনিয়ায় যুবদলের ৪৮ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও আনন্দ র‍্যালি তারেক রহমান ও বিএনপির বিরুদ্ধে চক্রান্ত চালাচ্ছে ফ্যাসিস্ট ও গুপ্ত বাহিনী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যারিয়ার নির্ধারণী কর্মশালা ও উপাচার্যের দিকনির্দেশনা

মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ ও ১৪ ডিসেম্বর

মাইদুল ইসলাম মুকুল  শিক্ষক, সাংবাদিক ও লেখক
  • আপডেট সময় : ০৭:৪৫:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩ ৪১১ বার পড়া হয়েছে

মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ ও ১৪ ডিসেম্বর

(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ ও ১৪ ডিসেম্বর

পাকিস্তান নামক সাম্প্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক ও অবৈজ্ঞানিক একটি রাষ্ট্রের জন্মের শুরু থেকেই তারা পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের সাথে বিমাতা সুলভ নীতি অবলম্বন করে।

কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ নীতির বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় এদেশের মুক্তিকামী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ভালো করেই জানতো, কোন দেশ বা জাতিকে চিরদিনের জন্য দমিয়ে রাখার সবচাইতে ভালো উপায় হচ্ছে সেই দেশের বুদ্ধি ভিত্তিক চিন্তার প্রসারতা বন্ধ করে দেয়া ।

ফলে, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রথম এবং প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে পরে পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীদের দমিয়ে রাখা। তাই পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার চেতনাকে চিরতরে দুর্বল করে দেয়ার জন্য তারা এদেশের বুদ্ধিজীবীদের নির্মূল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষকরা বলছেন, পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর নির্দেশনা মোতাবেক বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের মূল নকশা করেছিলেন রাও ফরমান আলী নামে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ এক কর্মকর্তা।

যুদ্ধে বাঙালির বিরুদ্ধে সহজে জয় লাভ করা এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামী মানুষ যেন ভবিষ্যতে আর কোনদিন মাথাচাড়া দিতে না পারে সেজন্য মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই দেশের চেতনা শক্তির মূল উৎস বুদ্ধিজীবীদের নির্মূল করার জন্য সারা দেশের বুদ্ধিজীবীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করে তারা। তালিকায় ছিলেন শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী এবং সাংবাদিক সহ বিভিন্ন পেশার প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা।

মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর পরাজয়ের পর ঢাকার গভর্নর হাউস থেকে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর একটি ডাইরি উদ্ধার করা হয়। সেখানে অনেক নিহত ও নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের নাম লেখা ছিল। মুলত: এ তালিকা অনুসরণ করেই মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে এদেশের বুদ্ধিজীবীদেরকে বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছিল।

ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের মতে, জুন মাস থেকে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার সমস্ত দায়িত্ব দেয়া হয় আল বদর বাহিনীকে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মে মাসে সাংবাদিক পরিচয়ে ঢাকায় এসেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সহকারী হেনরি কিসিঞ্জার এবং তার দুই বিশেষ দূত ডুসপিক ও হেইট।

ডুসপিক ছিলেন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির ও হেইট ছিলেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা। তারা বর্তমান বঙ্গভবনে (তৎকালীন গভর্নর হাউস) মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সাথে বৈঠক করেন। হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশে ব্যাপক পরিসরে গণহত্যা হোক সেটা চাননি ।

তাই পরিকল্পনা হয়েছিল বুদ্ধিজীবী নির্মূল প্রক্রিয়াকেই ত্বরান্বিত করার যাতে সামগ্রিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের শক্তির মেরুদন্ড একেবারে ভেঙে দেয়া যায়। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আল বদর বাহিনীকে যাবতীয় সুবিধা প্রদান করে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী।

যুদ্ধ বিজয়ের পর আল বদর বাহিনীর প্রধান আশরাফুজ্জামান খানের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা একটি ডাইরিতে ২০ জন বুদ্ধিজীবীর নামের তালিকা পাওয়া যায়। তারা সবাই নিখোঁজ বা হত্যার শিকার হয়েছিলেন।

এদের মধ্যে ৮ জন বুদ্ধিজীবীকে আশরাফুজ্জামান খান নিজের হাতে গুলি করে হত্যা করেছিলেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাক্ষ্য গ্রহণে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা বলেন, ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যেসব বুদ্ধিজীবীদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তার বেশিরভাগ ঘটনাতেই উপস্থিত ছিলেন আল বদরের চিফ এক্সিকিউটর আশরাফুজ্জামান খান এবং আল বদরের অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মুঈনুদ্দীন।

পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরো সম্পৃক্ত ছিলেন আল বদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা মতিউর রহমান নিজামী, সেকেন্ড ইন কমান্ড আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের চিকিৎসক ডাক্তার এহসান, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রধান ইমরান, এবিএম খালেক মজুমদার, মাওলানা আব্দুল মান্নান ও আব্দুল কাদের মোল্লা।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পুরো সময় ধরে পরিকল্পিতভাবে বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হলেও এর শেষ আঘাতটি আসে ১৪ ডিসেম্বর।

সেদিন একযোগে বহু বুদ্ধিজীবীকে তাদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর সূচনা হয় দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে তার বাসা থেকে উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে।

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে উঠিয়ে নেওয়ার সময় মুখের কাপড় সরে গেলে প্রকাশ পায় আলবদরের অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের চেহারা।

তাকে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর চিনে ফেলার অন্যতম কারণ তিনি বাংলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন। এর একটু পরে সেন্ট্রাল রোডের বাসা থেকে প্রখ্যাত নাট্যকার, শিক্ষাবিদ, সাহিত্য সমালোচক, ভাষাবিজ্ঞানী এবং বাচিকশিল্পী মুনীর চৌধুরীকে তুলে নেয় আল বদর বাহিনী। সেদিন সন্ধ্যায় কায়েতটুলির বাসা থেকে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক শহীদুল্লা কায়সারকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেই রাতে দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী আল বদরের একটি দল বিশিষ্ট কবি ও কথা সাহিত্যিক অধ্যাপক আনোয়ার পাশাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা থেকে চোখ বেঁধে নিয়ে যায় এবং মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের কাছে হত্যা করে।

এভাবে ১৪ ডিসেম্বর সেদিন অগণিত বুদ্ধিজীবীকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল আলবদর বাহিনী। ১৪ ডিসেম্বর ঠিক কতজনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এর সঠিক তালিকা পাওয়া যায় না।

এছাড়াও ১৫ ডিসেম্বর আল বদররা তুলে নেয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ফজলে রাব্বিকে ।

১৬ ডিসেম্বর আল বদর সদস্যরা বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্স সাইন্স এন্ড টেকনোলজির অধ্যাপক ডাক্তার আবুল কালাম আজাদকে। তাদের অনেকের লাশ পাওয়া যায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। আবার অনেককে আর কখনো খুঁজেই পাওয়া যায়নি।

২৫ শে মার্চ কালো রাত থেকে ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় ধরে একের পর এক বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হলেও কেন ১৪ ডিসেম্বর দিনটিকেই শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ঘোষণা করা হলো?

এক্ষেত্রে ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন মনে করেন, ১৪ ডিসেম্বর কে বুদ্ধিজীবী দিবস করা হয়েছে এর কারণ এই দিনে একযোগে অনেক বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের মানুষ বা সরকার বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের যারা ৫২ সাল বা ৪৭ থেকে একটা বড় অবদান রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের সকল আন্দোলনে, তাদেরকে সম্মান জানানোর জন্যই মূলতঃ এই দিনটিকে বেছে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাপিডিআর হিসাব মতে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নয় মাসে আল বদর, আল শামস ও রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মোট ১ হাজার ১১১ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি হানাদার ও আল বদর বাহিনী। তবে ২০২০ সালের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রাথমিক তালিকায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা ১ হাজার ২২২ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে ।

ইতিহাসবিদরা বলছেন, সংখ্যার দিক থেকে বিবেচনা না করে যদি জনসংখ্যা আর মৃত্যুর হার হিসেবে হিসাব করা হয় তাহলে অন্যান্য ঢাকার বাইরে জেলাগুলোতে আরো বেশি সংখ্যক বুদ্ধিজীবী মারা গেছেন কিন্তু এ বিষয়ে জেলাভিত্তিক ইতিহাস সংরক্ষণ না থাকায় নিজ জেলার মানুষজনও তাদের সেভাবে চেনে না।

কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব এর নাম আমরা কুড়িগ্রামবাসী কতটুকু জানি? আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার (৩ জানুয়ারি ১৯৪৩- ৭ আগস্ট ১৯৭১) ছিলেন কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ কুড়িগ্রাম কলেজের ইতিহাস বিভাগের একজন অধ্যাপক। ১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন এই বুদ্ধিজীবী।

তিনি শুধুমাত্র একজন বুদ্ধিজীবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্বাধীনতার যুদ্ধে একজন সক্রিয় সৈনিক। ১৯৭১ সালে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ার জন্য তিঁনি তাঁর ছাত্রদের সুসংগঠিত করার পরিকল্পনা করেন ।

এর কয়েকদিন পরই তিঁনি সপরিবারে কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে নিজ গ্রামে চলে যান এবং এলাকার বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সংগঠিত করতে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় ওয়াহাব তালুকদার ১ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত বামনহাট যুব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন। এবং পরবর্তীতে ৬নং সেক্টরের অধীন বামনহাট যুব শিবিরের ক্যাম্প ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ভারতের বামনহাটে ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকে প্রায়শই তিঁনি তাঁর নিজ এলাকা ভুরুঙ্গামারী থানার সিংঝাড় গ্রামে আসতেন।

উদ্দেশ্য ছিল নিজ পরিবারের সাথে দেখা করা এবং নিজ গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দেয়া। ১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট তিনি সিংঝাড় থেকে বামনহাটের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। পথিমধ্যে বামনহাট থেকে আসা কয়েকজন সহকর্মীসহ সিংঝাড় গ্রামে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত বগনী-সেতুতে অবস্থানরত একদল মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে যুদ্ধের বিভিন্ন কলাকৌশল নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।

এমন সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একদল সিপাই সুপরিকল্পিতভাবে রেল লাইনের পাশ দিয়ে এসে অতর্কিত আক্রমণ করে। অতর্কিত এই আক্রমণে পুরো দলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার রেললাইন ধরে দৌড়াতে থাকেন।

পাকিস্তানি বাহিনী তাকে লক্ষ্য করে ব্রাশ ফায়ার করতে থাকলে তিনি রেললাইনের পাশের জঙ্গলে আত্মগোপন করেন। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ঠিকই খুঁজে বের করে এবং নৃশংসভাবে হত্যা করে।

এরপর তাকে ফেলে দেয়া হয় পার্শ্ববর্তী একটি ডোবায়। পরে ভারতীয় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বগনী নদীর কিনারে অবস্থিত কালমাটি মসজিদ চত্বরে তাঁকে দাফন করা হয়।

শহীদ আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের নামে কুড়িগ্রাম শহরে একটি সড়ক রয়েছে এবং ঐতিহ্যবাহী কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে একটি ছাত্রাবাস রয়েছে। তবে প্রতিবছর ৭ আগস্ট আমরা কুড়িগ্রামবাসী কতটুকু স্মরণ করি এই শহীদ বুদ্ধিজীবীকে?

ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা আরো বলছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড নিয়ে আসলে তেমন কোন গবেষণা হয়নি। ফলে এসব তথ্য সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া যায় না । এখন প্রয়োজন জেলাভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তালিকা; যে কাজটি বাংলা একাডেমির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্প (১৯৯৭-২০০১) করছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় প্রকল্পটি অসমাপ্ত রয়ে যায়।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ৫ দশক পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত কেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা গেল না, এ প্রশ্ন থেকেই যায়। জানিনা আর কতকাল অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

লেখক –
মাইদুল ইসলাম মুকুল
শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
তথ্যসূত্র – বাংলা পিডিয়া, বিবিসি বাংলা ও ডেইলি স্টার।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ ও ১৪ ডিসেম্বর

আপডেট সময় : ০৭:৪৫:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩

মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ ও ১৪ ডিসেম্বর

পাকিস্তান নামক সাম্প্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক ও অবৈজ্ঞানিক একটি রাষ্ট্রের জন্মের শুরু থেকেই তারা পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের সাথে বিমাতা সুলভ নীতি অবলম্বন করে।

কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ নীতির বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় এদেশের মুক্তিকামী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ভালো করেই জানতো, কোন দেশ বা জাতিকে চিরদিনের জন্য দমিয়ে রাখার সবচাইতে ভালো উপায় হচ্ছে সেই দেশের বুদ্ধি ভিত্তিক চিন্তার প্রসারতা বন্ধ করে দেয়া ।

ফলে, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রথম এবং প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে পরে পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীদের দমিয়ে রাখা। তাই পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার চেতনাকে চিরতরে দুর্বল করে দেয়ার জন্য তারা এদেশের বুদ্ধিজীবীদের নির্মূল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষকরা বলছেন, পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর নির্দেশনা মোতাবেক বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের মূল নকশা করেছিলেন রাও ফরমান আলী নামে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ এক কর্মকর্তা।

যুদ্ধে বাঙালির বিরুদ্ধে সহজে জয় লাভ করা এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামী মানুষ যেন ভবিষ্যতে আর কোনদিন মাথাচাড়া দিতে না পারে সেজন্য মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই দেশের চেতনা শক্তির মূল উৎস বুদ্ধিজীবীদের নির্মূল করার জন্য সারা দেশের বুদ্ধিজীবীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করে তারা। তালিকায় ছিলেন শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী এবং সাংবাদিক সহ বিভিন্ন পেশার প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা।

মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর পরাজয়ের পর ঢাকার গভর্নর হাউস থেকে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর একটি ডাইরি উদ্ধার করা হয়। সেখানে অনেক নিহত ও নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের নাম লেখা ছিল। মুলত: এ তালিকা অনুসরণ করেই মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে এদেশের বুদ্ধিজীবীদেরকে বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছিল।

ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের মতে, জুন মাস থেকে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার সমস্ত দায়িত্ব দেয়া হয় আল বদর বাহিনীকে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মে মাসে সাংবাদিক পরিচয়ে ঢাকায় এসেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সহকারী হেনরি কিসিঞ্জার এবং তার দুই বিশেষ দূত ডুসপিক ও হেইট।

ডুসপিক ছিলেন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির ও হেইট ছিলেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা। তারা বর্তমান বঙ্গভবনে (তৎকালীন গভর্নর হাউস) মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সাথে বৈঠক করেন। হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশে ব্যাপক পরিসরে গণহত্যা হোক সেটা চাননি ।

তাই পরিকল্পনা হয়েছিল বুদ্ধিজীবী নির্মূল প্রক্রিয়াকেই ত্বরান্বিত করার যাতে সামগ্রিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের শক্তির মেরুদন্ড একেবারে ভেঙে দেয়া যায়। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আল বদর বাহিনীকে যাবতীয় সুবিধা প্রদান করে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী।

যুদ্ধ বিজয়ের পর আল বদর বাহিনীর প্রধান আশরাফুজ্জামান খানের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা একটি ডাইরিতে ২০ জন বুদ্ধিজীবীর নামের তালিকা পাওয়া যায়। তারা সবাই নিখোঁজ বা হত্যার শিকার হয়েছিলেন।

এদের মধ্যে ৮ জন বুদ্ধিজীবীকে আশরাফুজ্জামান খান নিজের হাতে গুলি করে হত্যা করেছিলেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাক্ষ্য গ্রহণে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা বলেন, ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যেসব বুদ্ধিজীবীদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তার বেশিরভাগ ঘটনাতেই উপস্থিত ছিলেন আল বদরের চিফ এক্সিকিউটর আশরাফুজ্জামান খান এবং আল বদরের অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মুঈনুদ্দীন।

পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরো সম্পৃক্ত ছিলেন আল বদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা মতিউর রহমান নিজামী, সেকেন্ড ইন কমান্ড আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের চিকিৎসক ডাক্তার এহসান, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রধান ইমরান, এবিএম খালেক মজুমদার, মাওলানা আব্দুল মান্নান ও আব্দুল কাদের মোল্লা।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পুরো সময় ধরে পরিকল্পিতভাবে বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হলেও এর শেষ আঘাতটি আসে ১৪ ডিসেম্বর।

সেদিন একযোগে বহু বুদ্ধিজীবীকে তাদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর সূচনা হয় দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে তার বাসা থেকে উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে।

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে উঠিয়ে নেওয়ার সময় মুখের কাপড় সরে গেলে প্রকাশ পায় আলবদরের অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের চেহারা।

তাকে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর চিনে ফেলার অন্যতম কারণ তিনি বাংলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন। এর একটু পরে সেন্ট্রাল রোডের বাসা থেকে প্রখ্যাত নাট্যকার, শিক্ষাবিদ, সাহিত্য সমালোচক, ভাষাবিজ্ঞানী এবং বাচিকশিল্পী মুনীর চৌধুরীকে তুলে নেয় আল বদর বাহিনী। সেদিন সন্ধ্যায় কায়েতটুলির বাসা থেকে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক শহীদুল্লা কায়সারকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেই রাতে দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী আল বদরের একটি দল বিশিষ্ট কবি ও কথা সাহিত্যিক অধ্যাপক আনোয়ার পাশাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা থেকে চোখ বেঁধে নিয়ে যায় এবং মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের কাছে হত্যা করে।

এভাবে ১৪ ডিসেম্বর সেদিন অগণিত বুদ্ধিজীবীকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল আলবদর বাহিনী। ১৪ ডিসেম্বর ঠিক কতজনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এর সঠিক তালিকা পাওয়া যায় না।

এছাড়াও ১৫ ডিসেম্বর আল বদররা তুলে নেয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ফজলে রাব্বিকে ।

১৬ ডিসেম্বর আল বদর সদস্যরা বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্স সাইন্স এন্ড টেকনোলজির অধ্যাপক ডাক্তার আবুল কালাম আজাদকে। তাদের অনেকের লাশ পাওয়া যায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। আবার অনেককে আর কখনো খুঁজেই পাওয়া যায়নি।

২৫ শে মার্চ কালো রাত থেকে ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় ধরে একের পর এক বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হলেও কেন ১৪ ডিসেম্বর দিনটিকেই শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ঘোষণা করা হলো?

এক্ষেত্রে ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন মনে করেন, ১৪ ডিসেম্বর কে বুদ্ধিজীবী দিবস করা হয়েছে এর কারণ এই দিনে একযোগে অনেক বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের মানুষ বা সরকার বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের যারা ৫২ সাল বা ৪৭ থেকে একটা বড় অবদান রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের সকল আন্দোলনে, তাদেরকে সম্মান জানানোর জন্যই মূলতঃ এই দিনটিকে বেছে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাপিডিআর হিসাব মতে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নয় মাসে আল বদর, আল শামস ও রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মোট ১ হাজার ১১১ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি হানাদার ও আল বদর বাহিনী। তবে ২০২০ সালের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রাথমিক তালিকায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা ১ হাজার ২২২ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে ।

ইতিহাসবিদরা বলছেন, সংখ্যার দিক থেকে বিবেচনা না করে যদি জনসংখ্যা আর মৃত্যুর হার হিসেবে হিসাব করা হয় তাহলে অন্যান্য ঢাকার বাইরে জেলাগুলোতে আরো বেশি সংখ্যক বুদ্ধিজীবী মারা গেছেন কিন্তু এ বিষয়ে জেলাভিত্তিক ইতিহাস সংরক্ষণ না থাকায় নিজ জেলার মানুষজনও তাদের সেভাবে চেনে না।

কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব এর নাম আমরা কুড়িগ্রামবাসী কতটুকু জানি? আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার (৩ জানুয়ারি ১৯৪৩- ৭ আগস্ট ১৯৭১) ছিলেন কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ কুড়িগ্রাম কলেজের ইতিহাস বিভাগের একজন অধ্যাপক। ১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন এই বুদ্ধিজীবী।

তিনি শুধুমাত্র একজন বুদ্ধিজীবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্বাধীনতার যুদ্ধে একজন সক্রিয় সৈনিক। ১৯৭১ সালে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ার জন্য তিঁনি তাঁর ছাত্রদের সুসংগঠিত করার পরিকল্পনা করেন ।

এর কয়েকদিন পরই তিঁনি সপরিবারে কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে নিজ গ্রামে চলে যান এবং এলাকার বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সংগঠিত করতে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় ওয়াহাব তালুকদার ১ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত বামনহাট যুব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন। এবং পরবর্তীতে ৬নং সেক্টরের অধীন বামনহাট যুব শিবিরের ক্যাম্প ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ভারতের বামনহাটে ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকে প্রায়শই তিঁনি তাঁর নিজ এলাকা ভুরুঙ্গামারী থানার সিংঝাড় গ্রামে আসতেন।

উদ্দেশ্য ছিল নিজ পরিবারের সাথে দেখা করা এবং নিজ গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দেয়া। ১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট তিনি সিংঝাড় থেকে বামনহাটের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। পথিমধ্যে বামনহাট থেকে আসা কয়েকজন সহকর্মীসহ সিংঝাড় গ্রামে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত বগনী-সেতুতে অবস্থানরত একদল মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে যুদ্ধের বিভিন্ন কলাকৌশল নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।

এমন সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একদল সিপাই সুপরিকল্পিতভাবে রেল লাইনের পাশ দিয়ে এসে অতর্কিত আক্রমণ করে। অতর্কিত এই আক্রমণে পুরো দলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার রেললাইন ধরে দৌড়াতে থাকেন।

পাকিস্তানি বাহিনী তাকে লক্ষ্য করে ব্রাশ ফায়ার করতে থাকলে তিনি রেললাইনের পাশের জঙ্গলে আত্মগোপন করেন। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ঠিকই খুঁজে বের করে এবং নৃশংসভাবে হত্যা করে।

এরপর তাকে ফেলে দেয়া হয় পার্শ্ববর্তী একটি ডোবায়। পরে ভারতীয় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বগনী নদীর কিনারে অবস্থিত কালমাটি মসজিদ চত্বরে তাঁকে দাফন করা হয়।

শহীদ আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের নামে কুড়িগ্রাম শহরে একটি সড়ক রয়েছে এবং ঐতিহ্যবাহী কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে একটি ছাত্রাবাস রয়েছে। তবে প্রতিবছর ৭ আগস্ট আমরা কুড়িগ্রামবাসী কতটুকু স্মরণ করি এই শহীদ বুদ্ধিজীবীকে?

ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা আরো বলছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড নিয়ে আসলে তেমন কোন গবেষণা হয়নি। ফলে এসব তথ্য সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া যায় না । এখন প্রয়োজন জেলাভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তালিকা; যে কাজটি বাংলা একাডেমির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্প (১৯৯৭-২০০১) করছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় প্রকল্পটি অসমাপ্ত রয়ে যায়।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ৫ দশক পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত কেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা গেল না, এ প্রশ্ন থেকেই যায়। জানিনা আর কতকাল অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

লেখক –
মাইদুল ইসলাম মুকুল
শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
তথ্যসূত্র – বাংলা পিডিয়া, বিবিসি বাংলা ও ডেইলি স্টার।

Facebook Comments Box