ঢাকা ১২:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

শরিফ ও শরিফা -সাব্বির রায়হান

সাব্বির রায়হান
  • আপডেট সময় : ০৪:১০:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৪ ৪৪৭ বার পড়া হয়েছে

শরিফ ও শরিফা -সাব্বির রায়হান

আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

শরিফ ও শরিফা -সাব্বির রায়হান

শরিফ আর শরিফা দুই ভাই-বোন, বাবা আর মায়ের সাথে ঢাকার বনানীতে বসবাস করেন। স্কুলের ছুটি পেয়ে বাবা-মায়ের সাথে ঢাকা থেকে দাদা বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও বেড়াতে যাচ্ছে। এটাই তাদের জীবনে প্রথম ট্রেন ভ্রমণ, তাই ওরা দুজনেই খুব আনন্দিত, শরিফ পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে আর শরিফা চতুর্থ শ্রেণিতে। শরিফ-শরিফার বাবা জনাব আশরাফ সাহেব রাজধানীর একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

ঢাকা কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে তারা ময়মনসিংহগামী -মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনটিতে ৪টি টিকিট কেটে ওঠে বসে ,পরে ট্রেনটি কমলাপুর থেকে ছেড়ে, জয়দেবপুর রেলস্টেশনে থামলে একদল হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ) মানুষ ট্রেনটিতে উঠে পরে।

ট্রেনের জানালার কাঁচ দিয়ে সে দৃশ্য দেখে শরিফ ও শরিফা,, দুই ভাই-বোনই ওদের দেখে কিছুক্ষণ খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে । ‘মানুষগুলো মেয়েদের মত দেখতে, কিন্তু অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি, ঠোঁটে কড়া লিপস্টিক, কপালে বড় টিপ, মুখেও অনেক মেকাপ, দেখতে কেমন যেন একটু অদ্ভুত লাগে। ওরা সবচেয়ে অবাক হয়, মেয়েদের মত দেখতে হলেও ওদের গলার আওয়াজ ঠিকই ছেলেদের মত।

পড়ুন>>নবীন লেখকের কবিতা

শরিফা ভয় পেয়ে মায়ের আঁচলে লুকোতে চায়… কৌতুহল জাগে শরিফের মনে, সে বাবাকে জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা, বাবা কে এরা তাদের বাড়ি কোথায় তাদের দেখতে এমন কেন তারা কোন ধর্মের মানুষ ?’

আশরাফ সাহেব বলেন, ‘ওরা তোমার আমার মতই স্বাভাবিক মানুষ…, মহান সৃষ্টিকর্তা তোমাকে যেমন ছেলে বানিয়েছেন। তোমার ছোট্ট বোনটাকে যেমন মেয়ে বানিয়েছেন, তেমনি সৃষ্টিকর্তা ওদেরও এক বিশেষ ভাবে বানিয়েছেন।  ওদেরও বাবা-মা রয়েছে ওদের নির্দিষ্ট ধর্ম রয়েছে ,ওরা ছেলেও না, আবার মেয়েও না, ওদের বলা হয় থার্ড জেন্ডার বা তৃতীয় লিঙ্গ।’

বাবা-ছেলের এই প্রশ্নোত্তর পর্ব চলতে চলতেই সেই হিজড়াদের দলের একজন সদস্য ওদের কাছে আসে, কিছুটা পুরুষের মত ভাঙ্গা গলা সুরে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে বলে শরিফের বাবাকে। শরিফের বাবা আশরাফ সাহেব পকেট থেকে ২০ টাকার একটা নোট শরিফের হাতে দিয়ে বলেন, ‘নাও বাবা,এটা আন্টিকে দাও’…শরিফ ভয়ে টাকাটা হিজড়া মানুষটির দিকে বাড়িয়ে দেয়, টাকা নিয়ে মুচকি হাসি দেয় হিজড়া মহিলা, শরিফের গাল টেনে আদর করে দিয়ে বলে,’অনেক বড় হও বাবা’ আর শরীফার দিকে চেয়ে মুচকি হেসে দিয়ে চলে গেল।

এক পর্যায়ে চলে যায় হিজড়ার দল অন্য এই বগি থেকে অন্য বগিতে । কিন্তু কৌতুহল তখনও কাটেনি শরিফের,আবারও শরিফ জিজ্ঞেস করে তার বাবাকে,’আচ্ছা বাবা,ওরা যদি আমাদের মত স্বাভাবিক মানুষ হয়,তাহলে ওরা ট্রেনে ট্রেনে এভাবে ভিক্ষা করে কেন ?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক,শরিফ-শরিফার বাবা সুন্দর করে তার দুই ছেলে-মেয়েকে বুঝিয়ে বলেন, ‘ওরা আমাদের মত স্বাভাবিক মানুষ হলেও স্বাভাবিক মানুষের মত কাজ করার সুযোগ তেমন একটা ওরা সমাজে পায় না ,ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখার সুযোগও ওদের তেমন হয়না , সমাজে কিছু মানুষ ওদের দূর দূর করে, ফলে সমাজ ও পরিবার থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই।

বেশিরভাগ মানুষ তাদের দিকে, আড়চোখে তাকিয়ে থাকে। ওরা যদি সমাজে আট দশটা ছেলে মেয়ের মত সব জায়গায় সমান তালে পড়ালেখা ও চাকুরি করার সুযোগ পেত, তাহলে ওদের ট্রেনের বগিতে, বগিতে এভাবে ভিক্ষা করার প্রয়োজন হত না।

তাহলে তোমার মত বাবা-মায়ের আদর স্নেহ পেয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে তারা প্রতিষ্ঠিত হতে পারত। তোমার বাবার মত বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করতে পারত। সমাজের কিছু মানুষের কারণে তারা আজ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন।

এ কথা শুনে শরিফ এবং শরিফা দুঃখ প্রকাশ করে বাবা-মায়ের কাছে ওরা বলে,ওরা বড় হয়ে তৃতীয় লিঙ্গের এই অবহেলিত মানুষদের পাশে দাঁড়াবে, তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করবে আর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে, শরিফ-শরিফার বাবা-মা এই কথা শুনে খুব খুশি হয়‌ । বাবার মায়ের সাথে শরীফ ও শরিফা হিজড়াদের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলতে বলতে ট্রেনটি এসে গফরগাঁও পৌছায়। পড়ুন>> কালজয়ী কবিতাবলী

 

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

শরিফ ও শরিফা -সাব্বির রায়হান

আপডেট সময় : ০৪:১০:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৪

শরিফ ও শরিফা -সাব্বির রায়হান

শরিফ আর শরিফা দুই ভাই-বোন, বাবা আর মায়ের সাথে ঢাকার বনানীতে বসবাস করেন। স্কুলের ছুটি পেয়ে বাবা-মায়ের সাথে ঢাকা থেকে দাদা বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও বেড়াতে যাচ্ছে। এটাই তাদের জীবনে প্রথম ট্রেন ভ্রমণ, তাই ওরা দুজনেই খুব আনন্দিত, শরিফ পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে আর শরিফা চতুর্থ শ্রেণিতে। শরিফ-শরিফার বাবা জনাব আশরাফ সাহেব রাজধানীর একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

ঢাকা কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে তারা ময়মনসিংহগামী -মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনটিতে ৪টি টিকিট কেটে ওঠে বসে ,পরে ট্রেনটি কমলাপুর থেকে ছেড়ে, জয়দেবপুর রেলস্টেশনে থামলে একদল হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ) মানুষ ট্রেনটিতে উঠে পরে।

ট্রেনের জানালার কাঁচ দিয়ে সে দৃশ্য দেখে শরিফ ও শরিফা,, দুই ভাই-বোনই ওদের দেখে কিছুক্ষণ খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে । ‘মানুষগুলো মেয়েদের মত দেখতে, কিন্তু অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি, ঠোঁটে কড়া লিপস্টিক, কপালে বড় টিপ, মুখেও অনেক মেকাপ, দেখতে কেমন যেন একটু অদ্ভুত লাগে। ওরা সবচেয়ে অবাক হয়, মেয়েদের মত দেখতে হলেও ওদের গলার আওয়াজ ঠিকই ছেলেদের মত।

পড়ুন>>নবীন লেখকের কবিতা

শরিফা ভয় পেয়ে মায়ের আঁচলে লুকোতে চায়… কৌতুহল জাগে শরিফের মনে, সে বাবাকে জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা, বাবা কে এরা তাদের বাড়ি কোথায় তাদের দেখতে এমন কেন তারা কোন ধর্মের মানুষ ?’

আশরাফ সাহেব বলেন, ‘ওরা তোমার আমার মতই স্বাভাবিক মানুষ…, মহান সৃষ্টিকর্তা তোমাকে যেমন ছেলে বানিয়েছেন। তোমার ছোট্ট বোনটাকে যেমন মেয়ে বানিয়েছেন, তেমনি সৃষ্টিকর্তা ওদেরও এক বিশেষ ভাবে বানিয়েছেন।  ওদেরও বাবা-মা রয়েছে ওদের নির্দিষ্ট ধর্ম রয়েছে ,ওরা ছেলেও না, আবার মেয়েও না, ওদের বলা হয় থার্ড জেন্ডার বা তৃতীয় লিঙ্গ।’

বাবা-ছেলের এই প্রশ্নোত্তর পর্ব চলতে চলতেই সেই হিজড়াদের দলের একজন সদস্য ওদের কাছে আসে, কিছুটা পুরুষের মত ভাঙ্গা গলা সুরে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে বলে শরিফের বাবাকে। শরিফের বাবা আশরাফ সাহেব পকেট থেকে ২০ টাকার একটা নোট শরিফের হাতে দিয়ে বলেন, ‘নাও বাবা,এটা আন্টিকে দাও’…শরিফ ভয়ে টাকাটা হিজড়া মানুষটির দিকে বাড়িয়ে দেয়, টাকা নিয়ে মুচকি হাসি দেয় হিজড়া মহিলা, শরিফের গাল টেনে আদর করে দিয়ে বলে,’অনেক বড় হও বাবা’ আর শরীফার দিকে চেয়ে মুচকি হেসে দিয়ে চলে গেল।

এক পর্যায়ে চলে যায় হিজড়ার দল অন্য এই বগি থেকে অন্য বগিতে । কিন্তু কৌতুহল তখনও কাটেনি শরিফের,আবারও শরিফ জিজ্ঞেস করে তার বাবাকে,’আচ্ছা বাবা,ওরা যদি আমাদের মত স্বাভাবিক মানুষ হয়,তাহলে ওরা ট্রেনে ট্রেনে এভাবে ভিক্ষা করে কেন ?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক,শরিফ-শরিফার বাবা সুন্দর করে তার দুই ছেলে-মেয়েকে বুঝিয়ে বলেন, ‘ওরা আমাদের মত স্বাভাবিক মানুষ হলেও স্বাভাবিক মানুষের মত কাজ করার সুযোগ তেমন একটা ওরা সমাজে পায় না ,ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখার সুযোগও ওদের তেমন হয়না , সমাজে কিছু মানুষ ওদের দূর দূর করে, ফলে সমাজ ও পরিবার থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই।

বেশিরভাগ মানুষ তাদের দিকে, আড়চোখে তাকিয়ে থাকে। ওরা যদি সমাজে আট দশটা ছেলে মেয়ের মত সব জায়গায় সমান তালে পড়ালেখা ও চাকুরি করার সুযোগ পেত, তাহলে ওদের ট্রেনের বগিতে, বগিতে এভাবে ভিক্ষা করার প্রয়োজন হত না।

তাহলে তোমার মত বাবা-মায়ের আদর স্নেহ পেয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে তারা প্রতিষ্ঠিত হতে পারত। তোমার বাবার মত বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করতে পারত। সমাজের কিছু মানুষের কারণে তারা আজ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন।

এ কথা শুনে শরিফ এবং শরিফা দুঃখ প্রকাশ করে বাবা-মায়ের কাছে ওরা বলে,ওরা বড় হয়ে তৃতীয় লিঙ্গের এই অবহেলিত মানুষদের পাশে দাঁড়াবে, তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করবে আর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে, শরিফ-শরিফার বাবা-মা এই কথা শুনে খুব খুশি হয়‌ । বাবার মায়ের সাথে শরীফ ও শরিফা হিজড়াদের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলতে বলতে ট্রেনটি এসে গফরগাঁও পৌছায়। পড়ুন>> কালজয়ী কবিতাবলী

 

Facebook Comments Box