রাখাল থেকে কোটিপতি: টাঙ্গাইলের সখীপুরে বরই চাষে মোসলেমের অভাবনীয় সাফল্য
- আপডেট সময় : ০৮:৩৪:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
ছোটবেলায় মানুষের বাড়িতে রাখালের কাজ করা মোসলেম উদ্দিন এখন সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অভাবের কারণে পড়াশোনা করতে না পারা মোসলেম ১৯৯৭ সালে বিয়ের পর সংসার চালাতে ফেরি করে আচার ও বাদাম বিক্রি শুরু করেন। কখনো স্কুলের সামনে, কখনো বাড়ি বাড়ি ঘুরে সামান্য যা আয় হতো, তাতেই চলত তাঁর সংসার। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে সেই মোসলেম এখন একজন সফল উদ্যোক্তা।
২০১০ সালের দিকে তিনি প্রথম ছয় একর জমি ইজারা নিয়ে লেবু চাষে নামেন। লেবুর সফলতার পর তিনি নতুন কোনো কৃষি উদ্যোগের কথা ভাবতে থাকেন। তাঁর মাথায় আসে টক বরইয়ের কথা, যা আচার তৈরির জন্য নারীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় তাঁর নতুন যাত্রা। প্রথমে সখীপুরের গজারিয়া ইউনিয়নের কীর্ত্তনখোলা গ্রামে ১০ একর জমিতে তিনি আগাম জাতের টক বরই চাষ শুরু করেন। পরবর্তীতে উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের ইন্দারজানী গ্রামের সাতটি পৃথক স্থানে আরও ৪০ একর জমি ইজারা নিয়ে বরই চাষের বিস্তার ঘটান। সব মিলিয়ে এখন প্রায় ৫০ একর জমিতে তাঁর বিশাল বরই বাগান।
চলতি মৌসুমে মোসলেমের বাগান থেকে প্রায় এক কোটি টাকার বরই বিক্রির আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে তিনি ইতোমধ্যে প্রায় ১০ লাখ টাকার বরই বিক্রি সম্পন্ন করেছেন। গত আগস্ট মাসের শুরু থেকেই তাঁর বাগানে উৎপাদিত আগাম জাতের টক বরই বাজারে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিদিন বাগান থেকে ৮ থেকে ১০ বস্তা (প্রতি বস্তায় ৬০ কেজি) বরই ঢাকার কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারের পাইকারি আড়তে পাঠানো হয়। বর্তমানে প্রতি কেজি টক বরই ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যার ফলে প্রতিদিন গড়ে ৭২ হাজার থেকে ৯৬ হাজার টাকার বরই বিক্রি হচ্ছে।
গত মৌসুমটি অবশ্য কিছুটা প্রতিকূল ছিল। অতিরিক্ত বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফুল আসার সময় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন কমে গিয়েছিল। গত বছর ৫০ লাখ টাকার বরই বিক্রি হলেও খরচ বাদে লাভ ছিল মাত্র ছয়-সাত লাখ টাকা। তবে এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং উৎপাদন ভালো হওয়ায় তিনি প্রায় ৩০ লাখ টাকা নিট লাভের আশা করছেন। বড় ধরনের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁর বাগানের বড় ক্রেতা হওয়ায় পণ্য বিক্রিতেও তেমন কোনো ঝুঁকি নেই বলে তিনি জানান।
এই বরই বাগান শুধু মোসলেমের ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থাই পরিবর্তন করেনি, বরং স্থানীয়দের জন্য তৈরি করেছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। তাঁর বাগানে সারা বছর ১৫ জন শ্রমিক স্থায়ীভাবে কাজ করেন। বরই পাড়ার মৌসুমে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ জন শ্রমিক নিয়োজিত থাকেন। একসময় যে মানুষটি দোচালা ছনের ঘরে থাকতেন, তিনি এখন কৃষির উপার্জনে নিজ জমিতে তিনতলা ভবনের মালিক হয়েছেন।
পারিবারিক জীবনে মোসলেম এক কন্যা ও দুই পুত্রের বাবা। বড় ছেলে ঢাকার তেজগাঁও কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স শেষ করে মালয়েশিয়ার লিঙ্কন ইউনিভার্সিটি কলেজে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করছেন এবং ছোট ছেলে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। নিজের সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করার পেছনেও এই বরই চাষের আয় বড় ভূমিকা পালন করেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিয়ন্তা বর্মন জানান, আগাম জাতের টক বরই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে মোসলেম যে সাফল্য দেখিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। সখীপুরের মাটি ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। স্থানীয় কৃষি বিভাগ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে সব ধরনের মাঠপর্যায়ের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
নতুন উদ্যোক্তা বা বেকার তরুণদের উদ্দেশ্যে মোসলেম বলেন, সঠিকভাবে জাত নির্বাচন, পরিচর্যা ও সঠিক সময়ে বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করতে পারলে বরই চাষে অবশ্যই সফল হওয়া সম্ভব। তাঁর প্রায় ৫০ একর জমির এই বাগান কেবলই কোনো বাণিজ্যিক প্রকল্প নয়, বরং এটি তাঁর সংগ্রামী জীবনের বদলে যাওয়ার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০১০ সালের দিকে ১২ বছরের জন্য ছয় একর জমি ইজারা নিয়ে প্রথমবারের মতো লেবুর চাষ শুরু করেন মোসলেম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ৫ সেপ্টেম্বর মোসলেমের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে বড়ই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মানুষের বাড়িতে থেকে গরু-বাছুর চরিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেউ গাছ থেকে বরই পাড়ছেন, কেউ ঝুড়িতে তুলছেন, আবার কেউ বস্তায় ভরছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মোসলেম বলেন, যখন মৌসুম পুরোদমে চলে (নভেম্বর-ডিসেম্বর), তখন প্রতিদিন এক থেকে দেড় লাখ টাকার বরই বিক্রি হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১৫ জনের স্থায়ী কর্মসংস্থান বরইয়ের বাগান শুধু মোসলেমের ভাগ্যই বদলায়নি, কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে।
সূত্র: প্রথম আলো





















