জলবায়ুর হুমকিতে আশাশুনি: ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে কিশোর শক্তি
- আপডেট সময় : ০৮:৩৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
জলবায়ুর হুমকিতে আশাশুনি: ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে কিশোর শক্তি
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা যখন সাতক্ষীরার আশাশুনিকে এক প্রকার আশাহীন বলে গণ্য করছেন, তখন স্থানীয় কিশোর-কিশোরীদের একাংশ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন বুনছে। উপকূলীয় এই জনপদের প্রতাপনগর ইউনিয়নের ২৩টি গ্রামই এখন জলবায়ু পরিবর্তনের বড় হুমকির মুখে।
এসব গ্রামে নদীর ভাঙন বা দুর্যোগের চেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের স্থানত্যাগ। জীবিকার প্রয়োজনে গ্রামের অধিকাংশ কর্মক্ষম পুরুষ ঢাকা, চট্টগ্রাম বা খুলনার মতো বড় শহরগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন, যা পুরো পরিবার ব্যবস্থাকে অরক্ষিত করে তুলছে।
সাতক্ষীরায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকাগুলোর মধ্যে আশাশুনি অন্যতম। পেছন থেকে কেউ একজন বলে, ‘ওখানে মেলা তেল। বাঘের চেয়ে দুষ্ট মানুষের হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করা বেশি কঠিন।
পড়ুন>>সিডিএ স্কুলের ইংরেজি মাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদে অভিভাবকদের স্মারকলিপি
জলবায়ু পরিবর্তন তাদের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে এবং তা মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে তারা কী উদ্যোগ নিয়েছে—সেসবের হিসাব-নিকাশই ছিল খুলনার এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য। তুরস্কের আনাতোলিয়ায় অনুষ্ঠেয় জলবায়ু সম্মেলনে খুলনার শিশুদের প্রতিনিধিরাও যাবে। সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ইটভাটার মৌসুমে রিজার্ভ বাস যায় কমপক্ষে ১০টি জেলায়।
হাওলাদার পাড়ার বাসিন্দা তামান্না সুলতানা সেখানকার ‘বাবুই পাখি’ কমিউনিটি শিশু দলের নেতৃত্বে রয়েছেন। ২৩ গ্রামের এক গ্রাম হাওলাদার পাড়ায় থাকেন তামান্না সুলতানা। হাওলাদার পাড়ার লাগোয়া হরিশখালী, কুড়িকাহুনিয়া, শ্রীপুর, বনতলা, দিঘলারাইট আস্তে আস্তে খালি হয়ে যাচ্ছে। মেয়েরা কেন যশোর যাচ্ছে?—এ প্রশ্নে তামান্না, শাকিব, সুচনা, হালিম পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তাদের স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
তামান্নার মতে, বড়দের চলে যাওয়ার ফলে শিশুদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। ২০২৩ সালে কেউই ফেল করেনি। ২০২৫ ফেল করেছিল ১৫ জন।
বিশেষ করে শিশু পাচার এবং নানা ধরনের অপরাধের শিকার হওয়ার ভয় বাড়ছে প্রতিনিয়ত।
খুলনায় অনুষ্ঠিত আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনের প্রস্তুতি সভায় অংশ নেওয়া এই শিশুরা তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতিকূলতার চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতাপনগরের ইউনাইটেড একাডেমির শিক্ষার্থী তামান্না জানায়, শিক্ষার পরিবেশও দিন দিন খারাপ হচ্ছে; ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ৬২ জনের মধ্যে মাত্র ২৬ জন পাস করতে পেরেছে, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় হতাশাজনক। সেখানে কত দিন থাকা যাবে, সেটা কেউ বলতে পারে না। এর একটা কারণ হতে পারে কোভিড–১৯ অতিমারি। তিন–চার বছর আগেও এত শিক্ষার্থী ফেল করত না। বছর কয়েক আগে আমি কুমিল্লা অঞ্চলে গেলে আলাপ হয়েছিল ইটভাটার কর্মী বারো–তেরো বছরের আব্বাসের সঙ্গে।
তৃণমূল পর্যায়ে গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় অনেক শিক্ষার্থীকেই বাধ্য হয়ে ইটভাটায় শ্রম দিতে হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রামের প্রায় ৮৪ শতাংশ শিশু ইটভাটায় যাওয়ার আগে নিয়মিত স্কুলে যেত। দালালেরা অভাবী পরিবারগুলোকে অগ্রিম অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে শিশুদের নিয়ে যায়। অনেক সময় কাজের কষ্ট সইতে না পেরে বা পাওনা টাকা পরিশোধের চাপে শিশুরা অসহায় হয়ে পড়ে, এমনকি অকালে প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটেছে। এমনটাই বলেন প্রায়–হতাশ জলবায়ুবিশেষজ্ঞরা। ২০২১–২০২২ সালে প্রায় ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে যায়। তবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৪ সালের ‘বাংলাদেশের ইটভাটায় শিশুশ্রমের স্বাস্থ্যঝুঁকি’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, ইটভাটায় কাজে যোগ দেওয়ার আগে শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং গ্রামের প্রায় ৮৪ শতাংশ শিশু নিয়মিত স্কুলে যেত।
মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ স্কুল থেকে ঝরে পড়ার মূল কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। পরিবারপ্রধানরা জীবিকার সন্ধানে বাইরে গেলে মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এমনকি বিবাহিত কোনো মেয়ে পুনরায় স্কুলে ফিরতে চাইলে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো তাকে গ্রহণ করতে চায় না, যা একটি অলিখিত সামাজিক কুসংস্কারে পরিণত হয়েছে।
প্রতাপনগরের কিশোর-কিশোরীরা তাদের এলাকার উন্নয়নে জরুরি ভিত্তিতে নিম্নলিখিত পাঁচটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে
- প্রতিটি পাড়ায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা (বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও লবণমুক্ত পানি)
- উঁচু ও জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু স্কুল ও টয়লেট
- শিশুদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও খেলাধুলার নিরাপদ স্থান
- অপুষ্টি শনাক্তকরণ ও পুষ্টিসহায়তা
- বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ ও শিশুবান্ধব দুর্যোগ প্রস্তুতি।
শিশুবান্ধব দুর্যোগ প্রস্তুতির একটি সফল দৃষ্টান্ত তারা নিজেরাই তৈরি করেছে। নদী ভাঙনে রাস্তা খালে পরিণত হওয়ায় শিশুদের স্কুলে যাতায়াত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তখন তারা ইউনিয়ন পরিষদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি ভাসমান সেতু নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। এই উদ্যোগের ফলে অন্তত ১৪০ জন শিক্ষার্থী নিরাপদ যাতায়াতের পথ খুঁজে পেয়েছে। তামান্না দৃঢ়তার সঙ্গে বলে, তারা এখন আর নিছক শিশু নয়, বরং এলাকার ‘কিশোর শক্তি’ হিসেবে কাজ করতে চায় এবং অন্যদের তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়। আশাশুনির শিশু–কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, হারিয়ে যাচ্ছে মানে নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে এমন নয়। ওখানকার মানুষেরা চলে যাচ্ছে অন্য কোথাও। পাড়া বা গ্রামভিত্তিক শিশু–কিশোর দল তারা গড়ে তুলেছে। ছেলেরা কার্তিক মাসে ইটভাটায় কাজ করতে চলে যায়; তাদের আর বার্ষিক পরীক্ষা দেওয়া হয় না। কাজ শেষ করে বৈশাখ মাসে ফিরে এলে স্কুল আর তাদের নেয় না।
সূত্র: প্রথম আলো
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ


























