ঢাকা ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
দিনমজুরি করেও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেলেন সংগ্রামী আরাফাত ৩৪ বছরের পুরনো ভবন ভেঙে নতুন কারখানা গড়বে প্যাসিফিক জিন্স বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী বোর্ডে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হরমুজ প্রণালী ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের অপেক্ষায় ইরান ট্রেনের শেষ বগিতেই ৩৫ বছরের জীবন কাটিয়ে দিলেন সিরাজ মিয়া খুলনায় ১৫ মাস বকেয়া বেতনে ৩০ কর্মীকে ছাঁটাই বিমান কর্মকর্তা তাহসিফ হত্যায় দিশার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর সাজেকে ইউপিডিএফ ও জেএসএসের মধ্যে দেড় ঘণ্টা গোলাগুলি ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে জামানত হারালেন চরমোনাইয়ের প্রার্থীসহ তিনজন প্রতিবন্ধকতা জয় করে পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ: অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে স্বপ্ন ছোঁয়া কলি রানীর গল্প

দিনমজুরি করেও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেলেন সংগ্রামী আরাফাত

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪১:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

দিনমজুরি করেও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেলেন সংগ্রামী আরাফাত

 

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাগমারা পশ্চিমপাড়ার তরুণ আরাফাত হোসেন এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। অথচ তার জীবনের প্রতিটি দিনই কেটেছে চরম অভাব-অনটন আর কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

 

 

২০২১ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা আবুল কাশেমের মৃত্যু হলে পরিবারের হাল ধরতে হয় আরাফাতকে। সেই থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকার তাগিদে দিনমজুরের কাজ করে আসছেন এই মেধাবী তরুণ।

 

পড়ুন>>প্রতিবন্ধকতা জয় করে পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ: অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে স্বপ্ন ছোঁয়া কলি রানীর গল্প

দিনমজুরের কাজ সেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা—এভাবেই চলছিল ১৮ বছরের তরুণ আরাফাত হোসেনের জীবন। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় আরাফাতের বাবা আবুল কাশেম মারা যান। গত শনিবার প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে তাঁর এই সাফল্যে পরিবার ও এলাকাবাসী আনন্দিত। বাবা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবার মৃত্যুর পর চার বছরের ছোট ভাই ও মায়ের দায়িত্ব এসে পড়ে কিশোর আরাফাতের কাঁধে।

এসএসসি পাসের পর সংসারের চাপ আরও বাড়ায় পুরোদমে দিনমজুরের কাজে নামতে হয় আরাফাতকে। কঠোর পরিশ্রম ও আর্থিক সংকটে এসএসসিতে আশানুরূপ ফল না পেলেও তিনি ভেঙে পড়েননি। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার ও শনিবার ছাড়াও সপ্তাহের যেসব দিনে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস থাকত না, সেই দিনগুলোতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। গতকাল রোববার দুপুরে আরাফাতের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তিনি নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে।

পড়ুন>>

ভবানীগঞ্জ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন আরাফাত। তাঁর দিনগুলো চলত অতি সাধারণ রুটিনে—ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়াশোনা, এরপর মাঠে শ্রমিকের কাজ। সপ্তাহে চার দিন হাড়ভাঙা খাটুনি আর বাকি তিন দিন বাবার রেখে যাওয়া পুরনো সাইকেল চালিয়ে ছয় কিলোমিটার দূরের কলেজে যাতায়াত করতেন তিনি। পানবরজে সাহায্য করা ছাড়াও ধান কাটা ও মাটি কাটার কাজ করে তিনি পরিবারের সংসারের চাকা সচল রেখেছেন। এমনকি এই দুই বছরে তার ভালো এক জোড়া পোশাকও জোটেনি, যা ছিল তাতেই কাটিয়ে দিয়েছেন সময়। তবে মা সব সময় সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন বলেই তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়নি।’।

আরাফাতের মা শিল্পী খাতুন জানান, সংসার চালাতে তিনি নিজেও ছোট বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়ান। ছেলের এই সাফল্যে তিনি অত্যন্ত গর্বিত হলেও উচ্চশিক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। মা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আরাফাত অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। তিন বেলা খাবার কিংবা ভালো পোশাক কিনে দিতে পারিনি। ওকে শহরে পাঠিয়ে উচ্চশিক্ষিত করার ইচ্ছা আছে, কিন্তু সামর্থ্য কতটা থাকবে জানি না।’

নিজে সংগ্রামমুখর জীবন কাটালেও সাফল্যের রহস্য সম্পর্কে আরাফাত বলেন, অভাবের কারণে সব সহায়ক বা গাইড বই কেনা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে কলেজের শিক্ষকেরা তাকে বই ও পড়াশোনার বিষয়ে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। মায়ের সাহস আর অনুপ্রেরণাই তাকে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরাফাতের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তার কলেজের শিক্ষক মামুনুর রশিদ বলেন, ‘শত বাধা ও অভাবের মধ্যেও আরাফাত যে অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সে শুধু নিজের নয়, পুরো কলেজ পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেছে। এখন তার উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের এগিয়ে আসা উচিত।’

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

দিনমজুরি করেও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেলেন সংগ্রামী আরাফাত

আপডেট সময় : ০৮:৪১:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

 

দিনমজুরি করেও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেলেন সংগ্রামী আরাফাত

 

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাগমারা পশ্চিমপাড়ার তরুণ আরাফাত হোসেন এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। অথচ তার জীবনের প্রতিটি দিনই কেটেছে চরম অভাব-অনটন আর কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

 

 

২০২১ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা আবুল কাশেমের মৃত্যু হলে পরিবারের হাল ধরতে হয় আরাফাতকে। সেই থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকার তাগিদে দিনমজুরের কাজ করে আসছেন এই মেধাবী তরুণ।

 

পড়ুন>>প্রতিবন্ধকতা জয় করে পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ: অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে স্বপ্ন ছোঁয়া কলি রানীর গল্প

দিনমজুরের কাজ সেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা—এভাবেই চলছিল ১৮ বছরের তরুণ আরাফাত হোসেনের জীবন। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় আরাফাতের বাবা আবুল কাশেম মারা যান। গত শনিবার প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে তাঁর এই সাফল্যে পরিবার ও এলাকাবাসী আনন্দিত। বাবা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবার মৃত্যুর পর চার বছরের ছোট ভাই ও মায়ের দায়িত্ব এসে পড়ে কিশোর আরাফাতের কাঁধে।

এসএসসি পাসের পর সংসারের চাপ আরও বাড়ায় পুরোদমে দিনমজুরের কাজে নামতে হয় আরাফাতকে। কঠোর পরিশ্রম ও আর্থিক সংকটে এসএসসিতে আশানুরূপ ফল না পেলেও তিনি ভেঙে পড়েননি। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার ও শনিবার ছাড়াও সপ্তাহের যেসব দিনে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস থাকত না, সেই দিনগুলোতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। গতকাল রোববার দুপুরে আরাফাতের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তিনি নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে।

পড়ুন>>

ভবানীগঞ্জ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন আরাফাত। তাঁর দিনগুলো চলত অতি সাধারণ রুটিনে—ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়াশোনা, এরপর মাঠে শ্রমিকের কাজ। সপ্তাহে চার দিন হাড়ভাঙা খাটুনি আর বাকি তিন দিন বাবার রেখে যাওয়া পুরনো সাইকেল চালিয়ে ছয় কিলোমিটার দূরের কলেজে যাতায়াত করতেন তিনি। পানবরজে সাহায্য করা ছাড়াও ধান কাটা ও মাটি কাটার কাজ করে তিনি পরিবারের সংসারের চাকা সচল রেখেছেন। এমনকি এই দুই বছরে তার ভালো এক জোড়া পোশাকও জোটেনি, যা ছিল তাতেই কাটিয়ে দিয়েছেন সময়। তবে মা সব সময় সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন বলেই তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়নি।’।

আরাফাতের মা শিল্পী খাতুন জানান, সংসার চালাতে তিনি নিজেও ছোট বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়ান। ছেলের এই সাফল্যে তিনি অত্যন্ত গর্বিত হলেও উচ্চশিক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। মা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আরাফাত অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। তিন বেলা খাবার কিংবা ভালো পোশাক কিনে দিতে পারিনি। ওকে শহরে পাঠিয়ে উচ্চশিক্ষিত করার ইচ্ছা আছে, কিন্তু সামর্থ্য কতটা থাকবে জানি না।’

নিজে সংগ্রামমুখর জীবন কাটালেও সাফল্যের রহস্য সম্পর্কে আরাফাত বলেন, অভাবের কারণে সব সহায়ক বা গাইড বই কেনা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে কলেজের শিক্ষকেরা তাকে বই ও পড়াশোনার বিষয়ে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। মায়ের সাহস আর অনুপ্রেরণাই তাকে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরাফাতের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তার কলেজের শিক্ষক মামুনুর রশিদ বলেন, ‘শত বাধা ও অভাবের মধ্যেও আরাফাত যে অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সে শুধু নিজের নয়, পুরো কলেজ পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেছে। এখন তার উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের এগিয়ে আসা উচিত।’

Facebook Comments Box