ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাসেবা মিললেও চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম নিচ্ছেন সাধারণ রোগীরা
- আপডেট সময় : ০৩:৫২:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে
কিশোরী তমা আক্তারের বয়স মাত্র কয়েক বছর।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর হঠাৎ তাঁর পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হলে স্বজনেরা প্রথমে তাঁকে স্থানীয় একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরবর্তীতে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসার একপর্যায়ে শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় গত ১৩ অক্টোবর তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান, তমা গুরুতর কিডনি জটিলতায় ভুগছে এবং তাঁর রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২২ গুণ বেশি। সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় গত রোববার থেকে তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে নিয়মিত ডায়ালাইসিস দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে ৪২ শতাংশ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশ যায় ওষুধে, বেশির ভাগই দিতে হয় রোগীকে। জুয়েল জানান, বাড়িতে তিন সন্তান রেখে স্ত্রী শাহানাকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন।
হাসপাতালের সিঁড়ির নিচে বসবাস ও অর্থসংকট
গতকাল বুধবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউর সামনে উৎকণ্ঠিত অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায় তমার মা লিপি আক্তারকে। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার আটিগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দা লিপি আক্তার জানান, তাঁর চার সন্তানের মধ্যে তমা সবার বড়। ছোট সন্তানদের গ্রামে নানির জিম্মায় রেখে স্বামী তরফ আলীকে নিয়ে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অবস্থান করছেন। তমার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে তাঁকে ৩১০ নম্বর ওয়ার্ড থেকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। উপযুক্ত জায়গার অভাবে দম্পতি এখন হাসপাতালের সিঁড়ির নিচে পাটি পেতে দিন কাটাচ্ছেন।
- পেশায় রংমিস্ত্রি তমার বাবা তরফ আলী বিভিন্ন মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে, ধারদেনা করে এবং জমি বিক্রির টাকা থেকে এক মাসে মেয়ের চিকিৎসার পেছনে ইতিমধ্যে ৭২ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন।
- পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধারাবাহিকতায় প্রথম দিনেই সিটি স্ক্যানসহ নানা টেস্টে সাড়ে ৬ হাজার টাকা খরচ হয় এবং পরবর্তীতে ঢাকায় একটি বেসরকারি সেন্টারে ১২ হাজার টাকায় এমআরআই করাতে হয়।
- বর্তমানে প্রতি ডায়ালাইসিসে ৪০০ টাকা ব্যয় হচ্ছে; কিছু ওষুধ সরকারিভাবে পাওয়া গেলেও একটি বড় অংশ বাইরে থেকে চড়া দামে কিনতে হচ্ছে।
ঋণ ও জমি বিক্রির নির্মম বাস্তবতা
তমার পরিবার জানায়, গ্রামে তাঁদের নিজেদের কোনো ভিটেমাটি নেই। বাধ্য হয়ে অন্যের জায়গায় বসবাস করেন। আগে লিপি আক্তারের বাবার বাড়ি থেকে কিছু জমি পেয়েছিলেন। ঋণদাতাদের পাওনা টাকার তাগাদায় অতিষ্ঠ হয়ে পাঁচ মাস আগে চাচাতো ভাইয়ের কাছে মাত্র এক লাখ টাকায় সেই জমি বিক্রি করে দেন। পাওনা শোধের পর অবশিষ্ট থাকা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকাও মেয়ের চিকিৎসার পেছনে শেষ হয়ে গেছে। এখন খরচ বাঁচাতে মা-বাবা দুজনে সকালে দুটি রুটি এবং দুপুরে কেবল ডাল-ভাত খেয়ে দিন পার করছেন। অসহায় মা আকুতি জানিয়ে বলেন, কেউ যদি মেয়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়, তবে তিনি তাঁদের বাসায় আজীবন দাসি হিসেবে কাজ করতেও প্রস্তুত। তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় তমার বাবা তরফ আলী আসেন হাতে রক্ত পরীক্ষার ৩৫০ টাকার একটি স্লিপ নিয়ে। মেয়ের সুস্থতা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছেন না তিনি। তমার বাবা তরফ আলী বলেন, মেয়ে অসুস্থ হওয়ার পর সিটি স্ক্যান ও অন্যান্য পরীক্ষায় প্রথম দিনই সাড়ে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়। মেয়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমার মেয়েটা যে কী সুন্দর। স্বাস্থ্যসেবায় মাথাপিছু সরকারি খরচ মাত্র ১০৭০ টাকা।
চড়া সুদের ঋণে জর্জরিত অন্য রোগীরা
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে প্রায় চার মাস ধরে শয্যাশায়ী পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার ট্রলার দুর্ঘটনায় আহত জেলে জুয়েল সরদার। তিনি জানান, চার মাসের চিকিৎসায় তাঁর প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে, যার মধ্যে আড়াই লাখ টাকাই চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়েছে। এক বছরের মধ্যে সুদসহ তাঁকে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। চিকিৎসা শুরুর দিকে দিনে ১৫টি করে ওষুধ ও দুটি বিশেষ ইনজেকশন কিনতে হলেও বর্তমানে ওষুধের পরিমাণ কিছুটা কমে এসেছে এবং তার কয়েকটি সরকারিভাবে মিলছে। ডিএমসির বার্ন ইউনিটের বারান্দায় (রেড ইউনিটের অতিরিক্ত শয্যা ৩) প্রায় চার মাস ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন জুয়েল সরদার (৩৬)। ১০ দিন আগেও দিনে ১৫টি করে ওষুধ খেতে হতো। এর মধ্যে ১০টি নিজের কিনে খেতে হয়েছে। দুটো ইনজেকশন নিতে হতো ৮৫০ টাকা করে। চড়া সুদে ৮ হাজার টাকা ধার, চার সন্তান নিয়ে হাসপাতালে মা।
বিভিন্ন বিভাগের রোগীদের দুর্ভোগের বিবরণ
অর্থোপেডিক বিভাগে চিকিৎসাধীন মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার বাসিন্দা কাজল রানী মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে ভর্তি রয়েছেন। তাঁর স্বামী বর্তমানে বেকার। গত এক সপ্তাহে পরীক্ষা ও ওষুধ বাবদ তাঁর ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে, যার কারণে তিনি চড়া সুদে আট হাজার টাকা ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে নড়াইলের কালিয়া থেকে আসা চার বছরের শিশু তাহমিদ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে ভর্তি আছে। সামান্য বেতনের চাকরি করা বাবা কষ্ট করে ছেলের অস্ত্রোপচারের খরচ জোগাড়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
চিকিৎসা খরচের বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন জানান, ২ হাজার ৬০০ শয্যার বিপরীতে হাসপাতালে প্রতিদিন চার হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকে। অতিরিক্ত রোগীর চাপ, দীর্ঘ দিন অবস্থান এবং আনুষঙ্গিক খরচের কারণে রোগীদের পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা খসে। তবে বাজেটের তুলনায় রোগীর চাপ বেশি হলেও হাসপাতাল থেকে কোনো রোগীকে না ফিরিয়ে বিনামূল্যে অধিকাংশ ওষুধ ও খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে সেবার বাজেট আরও বাড়ানো হলে রোগীদের নিজস্ব ব্যয় কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। আর রোগী থাকে ৪ হাজারের বেশি।
সূত্র: প্রথম আলো

























