কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের কাজের চাপ, অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝা এবং নিজের ওপর অতিরিক্ত প্রত্যাশা থেকে একজন মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যেতে পারেন। একেই বলা হয় বার্নআউট। এটি কেবল সাধারণ ক্লান্তি নয়, বরং কর্মক্ষেত্রের দীর্ঘস্থায়ী চাপের একটি বহিঃপ্রকাশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, বার্নআউটের ফলে মানুষ চরম ক্লান্তি অনুভব করেন, কাজের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয় এবং কর্মদক্ষতা হ্রাস পায়। তবে সংস্থাটি বার্নআউটকে কোনো মানসিক রোগ বা অসুস্থতা হিসেবে গণ্য করে না।
যুক্তরাজ্যের জো হুপারের অভিজ্ঞতা বার্নআউটের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। ক্যারিয়ারে দ্রুত উন্নতির লক্ষ্যে তিনি সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এবং নিখুঁত কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও দীর্ঘ সময় কাজের চাপ তাকে শেষ পর্যন্ত বার্নআউটের দিকে ঠেলে দেয়।
মনোবিজ্ঞানী ও বিজনেস কোচ জিল উইলিয়ামস বলেন, যারা কাজে নিখুঁত হতে চান কিংবা সব সময় বাড়তি দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত থাকেন, তাদের বার্নআউটের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ, যে গুণগুলো কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের চাবিকাঠি, সেগুলোই কখনো কখনো অতিরিক্ত চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মেন্টাল হেলথ ইউকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রতি পাঁচজন তরুণ কর্মীর মধ্যে প্রায় দুজন কাজের চাপজনিত মানসিক সমস্যার কারণে ছুটি নিতে বাধ্য হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে বার্নআউট তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বার্নআউট কেবল চাকরির সঙ্গেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে চলা নিয়ন্ত্রণের বাইরের যেকোনো চাপ থেকে তৈরি হতে পারে। শিক্ষার্থী কিংবা পরিচর্যাকারীদের মধ্যেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় বার্নআউটকে উদ্বেগ বা বিষণ্নতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। যদিও এটি সরাসরি কোনো মানসিক রোগ নয়, তবে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে তা বিষণ্নতা বা উদ্বেগের মতো গুরুতর সমস্যার জন্ম দিতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী লক্ষণ দেখা দিলে একে সাধারণ ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া জরুরি।
বার্নআউট থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে অনেকেই ছুটির কথা বলেন। পাবলিক হেলথ ওয়েলসের অ্যামি ডেভিস মনে করেন, ছুটি বা বিরতি শরীর ও মনকে কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ দেয়, যা উপকারী। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু ছুটি নিলেই সমস্যার সমাধান হয় না; যে পরিবেশ বা পরিস্থিতি থেকে চাপ তৈরি হচ্ছে, সেটির পরিবর্তনও প্রয়োজন।
কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ এখানে বড় ভূমিকা পালন করে। কম বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং অসম্ভব কাজের চাপের মতো সমস্যাগুলো জিইয়ে রেখে শুধু কর্মীদের জন্য ‘ওয়েলবিয়িং’ উদ্যোগ নিলে মূল সমস্যার সমাধান হবে না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, বার্নআউটের লক্ষণগুলোকে শুরুতেই গুরুত্ব দিতে হবে। নিজের অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়ার অভ্যাস পর্যালোচনা করা এবং চাপের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। কর্মীকে কেবল ‘সহনশীল’ হওয়ার পরামর্শ না দিয়ে কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত কাজের বোঝা ও অস্বাস্থ্যকর প্রত্যাশা কমিয়ে আনা জরুরি।
Leave a Reply