আজ ৬ সেপ্টেম্বর। বাংলা ভাষা ও বাঙালির চিন্তার মুক্তির ইতিহাসে এটি একটি অনন্য স্মরণীয় দিন। ১৭৭৮ সালের এই দিনে অবিভক্ত বাংলার হুগলিতে চার্লস উইলকিন্স ও পঞ্চানন কর্মকারের হাত ধরে বাংলা চলনশীল হরফের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেদিন ধাতু গলিয়ে তৈরি হয়েছিল বাংলা অক্ষর, যা জ্ঞান ও চিন্তার প্রসারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
মুদ্রণপ্রযুক্তির আগমনের আগে বাংলায় জ্ঞান ছিল সীমিত পরিসরের সম্পদ। পুঁথির যুগে পাঠ ছিল মূলত সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা, যেখানে একজন পড়তেন আর অন্যরা শুনতেন। মুদ্রিত বই মানুষের হাতে পৌঁছানোর পর পাঠ ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। এর ফলে এমন এক পাঠকসমাজ গড়ে ওঠে, যারা শুধু শুনে তথ্য গ্রহণ করত না, বরং পড়ে, ভেবে ও প্রশ্ন করে নিজস্ব মতামত তৈরি করতে শিখত।
মুদ্রণভিত্তিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ছিল, যার কেন্দ্রে থাকতেন সম্পাদক। যদিও এই ব্যবস্থা পুরোপুরি নিরপেক্ষ ছিল না—রাজনৈতিক চাপ বা মালিকানার প্রভাব সংবাদমাধ্যমকে প্রভাবিত করত—তবুও এটি তথ্যের প্রবাহে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড বজায় রাখত।
ডিজিটাল যুগে একই শহরে থাকা দুই ব্যক্তি একই সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্যজগতে থাকতে পারেন। অ্যালগরিদম আমাদের আগ্রহ অনুসরণ করতে করতে একই ধরনের মতামত বারবার সামনে আনে, যা ‘ফিল্টার বাবল’ তৈরি করে। ফলে মানুষের মধ্যে একটি সাধারণ বাস্তবতার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
১৭৭৮ সালে পঞ্চানন কর্মকারের কাছে একটি বাংলা অক্ষর ছিল কারিগরি দক্ষতার চূড়ান্ত নিদর্শন। একটি হরফের বাঁক ও গঠন তৈরি করতে প্রচুর সময় ও শ্রম লাগত। আজ আমরা একটি বাক্য লিখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নির্দেশ দিতে পারি, যা সেকেন্ডের মধ্যে শত শত শব্দ তৈরি করে দেয়। একসময় মানুষ অক্ষর তৈরি করত, আজ মানুষ যন্ত্রকে নির্দেশ দেয়।
প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হচ্ছে, মানুষের নিজস্ব বিচারবোধের প্রয়োজনও তত বাড়ছে। তথ্য তৈরি করার ক্ষমতা মানুষের হাতে দ্রুত পৌঁছালেও, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি সেভাবে গড়ে ওঠেনি। আজকের এই প্রযুক্তি আরও দ্রুত ও সর্বব্যাপী, কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটি কি আমাদের স্বাধীনভাবে ভাবতে সাহায্য করছে, নাকি বিভ্রান্তির গোলকধাঁধায় বন্দী করছে?
১৭৭৮ সালের সেই হুগলির উনুনে ধাতু গলেছিল মানুষের ভাবনাকে অক্ষরের শরীর দেওয়ার জন্য। আজ অসংখ্য সার্ভারে তথ্যের প্রবাহ চলছে। অক্ষর মানুষকে পড়তে শিখিয়েছিল, এখন অ্যালগরিদমের যুগে আমাদের নতুন করে শিখতে হবে কীভাবে নিজের মতো করে ভাবতে হয়। প্রযুক্তি নয়, চিন্তার স্বাধীনতাই শেষ কথা—এই শিক্ষাটিই ১৭৭৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আমাদের আজও মনে করিয়ে দেয়।
Leave a Reply