ইরানের ওপর সরাসরি সামরিক হামলার পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট ব্যাসেন্ট এই পদক্ষেপকে ইরানের বিরুদ্ধে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় আর্থিক আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর লক্ষ্য হলো তেহরানের আয়ের অবশিষ্ট উৎসগুলো বন্ধ করে দেওয়া এবং ইরানকে বিচ্ছিন্ন করা।
একই সঙ্গে, যেসব ব্যাংক বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে অবস্থিত ৬০টি প্রতিষ্ঠান, জাহাজ ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের এই নতুন কৌশল উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। একদিকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি তাদের ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে সুরক্ষা দেয়, অন্যদিকে এই উপস্থিতিই তাদের ভূখণ্ডকে তেহরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই গত সপ্তাহে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, উপসাগরীয় কোনো দেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ শামিল হয়, তবে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে এক ফোঁটা তেলও বের হতে দেওয়া হবে না।
হরমুজ প্রণালি বর্তমানে সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে বড় ধরনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এই সংকটে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং গত সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন মাবন জানান, গত কয়েক মাসে ইরানের হামলায় ইউএই ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্কের কারণে ইউএইর অবস্থানকে এই অঞ্চলে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষক মিয়াদ মালেকির মতে, ইউএইর এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত ইরানের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক আঘাত হতে পারে, কারণ দুবাই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল।
তবে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের অবস্থান ভিন্ন। এই দেশগুলো তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে চায়। কাতার বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন, কারণ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা ও এলএনজি স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি তাদের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
এছাড়া, ইরান ও কাতার একটি বিশাল গ্যাসক্ষেত্র ভাগ করে নেওয়ায় দোহার জন্য তেহরানের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য।
ওমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে তারা ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
দোহার সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি রিসার্চের ভাইস প্রেসিডেন্ট রশিদ আল-মোহান্নাদ উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মধ্যস্থতাকারী পক্ষগুলো উভয় দেশকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরানোর চেষ্টা করছে।
সৌদি আরবের অবস্থানও আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তববাদী। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছে রিয়াদ।
এছাড়া, চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ‘মক্কা চুক্তি’ করেছে সৌদি আরব। বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ ইরানকে দুর্বল দেখতে চাইলেও দেশটির সরকারের পতন বা অস্থিতিশীলতা চায় না, কারণ এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।
ইরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোস্তফা খোশচেশমের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন নিষেধাজ্ঞা মূলত একটি ‘রাজনৈতিক প্রদর্শনী’, যার উদ্দেশ্য প্রতিবেশী দেশগুলোকে ভয় দেখানো। তিনি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির সঙ্গে এর মিল খুঁজে পান, যা শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে শেষ হয়েছিল।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান সাধারণত আত্মসমর্পণ না করে উত্তেজনা বাড়ানোর পথ বেছে নেয়। ফলে অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে তেহরান পাল্টা আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি কতটা গ্রহণ করতে প্রস্তুত। সামগ্রিকভাবে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর চেয়ে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথেই বেশি আগ্রহী।
Leave a Reply