৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত মো. জাবেদ হোসেন তার ভাইভা বোর্ডের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। ভাইভা কক্ষে প্রবেশের পর চেয়ারম্যান তাকে সালাম দিলে তিনিও সালামের উত্তর দেন।
এরপর চেয়ারম্যান তার পছন্দের ক্রম—প্রশাসন, পুলিশ ও কাস্টমস ক্যাডারের বিষয়টি নিশ্চিত করে ভাইভা শুরু করার অনুমতি দেন। পুরো ভাইভা প্রক্রিয়াটি প্রায় ১৫ থেকে ১৬ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল, যদিও সাধারণত প্রার্থীদের জন্য ১২ থেকে ১৩ মিনিট বরাদ্দ থাকে।
ভাইভার শুরুতে এক্সটারনাল ১ তাকে ডিসির দায়িত্ব ও কার্যাবলি নিয়ে প্রশ্ন করেন। জাবেদ জেলা প্রশাসক (ডিসি), ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এবং ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর হিসেবে ডিসির ভূমিকাগুলো ব্যাখ্যা করেন। সম্পূরক প্রশ্নে ডিসির রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্র এবং ইজারা দেওয়ার আর্থিক সীমা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।
জাবেদ জানান, ডিসি সাহেব কত টাকা পর্যন্ত ইজারা দিতে পারেন তা জানা না থাকায় তিনি তা স্কিপ করেন। এরপর ইউএনও হিসেবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং বাল্যবিবাহ নিরোধে বিচারিক ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। জাবেদ জানান, মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯-এর ৮ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২ বছরের সাজা দেওয়া সম্ভব।
ভাইভা বোর্ডে বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত আইন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। জাবেদকে প্রশ্ন করা হয় বাল্যবিবাহে ছেলে–মেয়ের বয়স কত ধরা হয় এবং বাল্যবিবাহ আইনে কোনো স্পেশাল কনসিডারেশন আছে কি না।
জাবেদ উত্তরে জানান, বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণ অথবা বাল্যবিবাহ হয়ে গেলে অভিভাবকদের সম্মতিতে তাদের কল্যাণের জন্য বিয়ে মেনে নেওয়ার সুযোগ আইনে রয়েছে। এরপর চেয়ারম্যান ম্যাম প্রশ্ন করেন, জাবেদের জীবনে এমন কখনো হয়েছে কি না যে তার সঙ্গের মানুষ বা সহকর্মীরা তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জাবেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিআর থাকাকালীন ক্লাস টেস্ট পেছানোর ইস্যুতে সহপাঠীদের বিরোধিতার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, শিক্ষকদের নির্দেশনা ও নিয়ম মেনে চলার কারণে তাকে এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, তবে তার কমিউনিকেশন স্কিল ও লিডারশিপ কোয়ালিটির কারণে সহপাঠীরা তাকে সিআর হিসেবে মেনে নিয়েছিল।
টিমওয়ার্কের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা নিয়ে জাবেদকে প্রশ্ন করা হলে তিনি থিসিস করার সময়ের একটি উদাহরণ দেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রজেক্ট সাবমিট করতে না পারা এক সহকর্মীর জন্য তিনি শিক্ষকের সাথে আলোচনা করে ডিফেন্স টাইম বাড়িয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। একাডেমিক বিষয়ের বাইরে শখের বসে কিছু শিখেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি গাছের গ্রাফ্টিং বা কলম করার কথা জানান। ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাকগ্রাউন্ডের হওয়ায় ম্যাম বিষয়টি বেশ আগ্রহ নিয়ে শোনেন এবং এক্সটারনাল ২-কে পরবর্তী প্রশ্ন করার সুযোগ দেন।
প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনার সময় সুনামগঞ্জের পাথর উত্তোলনের সমস্যাটি সামনে আসে। জাবেদকে প্রশ্ন করা হয়, সেখানে পদায়ন পেলে তিনি কী পদক্ষেপ নেবেন। তিনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, পাথর উত্তোলনের সীমা নির্ধারণ এবং নদীর নাব্যতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এছাড়া একাডেমিক জ্ঞান কীভাবে প্রশাসনে কাজে লাগাবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে জাবেদ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প মূল্যায়ন ও মনিটরিংয়ের কথা বলেন। প্রশাসনের পাঁচটি প্রধান সমস্যা হিসেবে তিনি লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব, প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব এবং সিটিজেন চার্টার সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতনতার অভাবকে চিহ্নিত করেন।
লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করার উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে জাবেদ বাংলা ভাষায় উত্তর দেওয়ার অনুমতি চান। তিনি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে পেপারলেস সিস্টেম, ই-ফাইলিং ও প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেন। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও সহযোগিতামূলক আচরণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। এরপর তাকে তার নিজের কাজের জায়গার সমস্যাগুলো নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। সবশেষে এক্সটারনাল ২ তার কাগজপত্র ফেরত দিয়ে শুভকামনা জানান এবং চেয়ারম্যান ম্যামও তাকে শুভকামনা জানিয়ে বিদায় দেন।
ভাইভা শেষে জাবেদ জানান, যদিও তিনি ফ্লুয়েন্টলি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তবে হার্টবিট ওঠানামার কারণে কথা বলার সময় কিছুটা জড়তা ছিল। তবুও তিনি নার্ভ ধরে রেখে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেন। তার পছন্দের ক্যাডার ছিল প্রশাসন, পুলিশ ও কাস্টমস। এই পুরো অভিজ্ঞতাটি একজন বিসিএস প্রার্থীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে প্রার্থীর উপস্থিত বুদ্ধি, আইনগত জ্ঞান এবং বাস্তবমুখী সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতা যাচাই করা হয়। জাবেদ হোসেনের এই অভিজ্ঞতা ৪৭তম বিসিএস প্রার্থীদের জন্য একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।
এক্স -২ ধন্যবাদ আপনার কাগজগুলো নেন।
প্র: ডিসি ডেপুটি কমিশনার হিসেবে কী করেন?
দুঃখিত, জানা নেই, বলে স্কিপ করলাম প্র: ইউএনও সাহেব নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে কীভাবে বিচারকাজ চালান উ: মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন, এ ছাড়া বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রেও বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন।
উ: জি ম্যাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিআর থাকাকালে ক্লাস টেস্ট পেছানোর জন্য ক্লাসমেটরা বললেও আমি এ ব্যাপারে স্যারদের বলতাম না।
উ: স্যার–ম্যামদের দিকনির্দেশনা থাকত ডিউ টাইমে যাতে পরীক্ষা হয়।
এ ছাড়া একবার পরীক্ষা পেছালে পরবর্তী সময়ে আবার পরীক্ষা পেছানোর ট্রেন্ড চালু হবে এই ভেবে।
উ: প্রথমে গ্রুপের সবার সঙ্গে বসে প্রাথমিক মিটিং করি, একটা আউটলাইন দাঁড় করাই; যেমন কাজটা কত দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে, এরপর দায়িত্ব ভাগ করে দিই এবং বেস্ট আউটপুট বের করে আনার চেষ্ঠা করি।
উ: তাঁদের মোটিভেট করার চেষ্টা করি এবং ইনফ্লুয়েন্স করে কাজ আদায় করার চেষ্টা করি।
যেহেতু তখন করোনা ছিল, সেটা বিবেচনা করে স্যারের সঙ্গে আলোচনা করে ডিফেন্স টাইমটা বাড়িয়ে নিয়েছিলাম এবং প্রজেক্ট সম্পন্ন করার জন্য আমরা সহযোগিতা করেছিলাম।
আপনাদের তো বিভিন্ন ভাষা শেখার অফার করা হয় (উনি ভার্সিটির বিভিন্ন ভাষা কোর্স ইঙ্গিত করেছেন, যেমন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপানিজ শেখায়) উ: বাংলা ছাড়া ইংরেজি শেখার চেষ্টা করেছি।
যেহেতু আমার বাইরে সেটেল হওয়ার প্ল্যান ছিল না, দেশে থাকারই ইচ্ছা, তাই অন্য ভাষা শেখা হয়ে ওঠেনি।
উ: গ্রাফ্টিং অন ট্রিস প্র: এটা তো আপনার সাবজেক্টিভের মনে হয়।
প্রশ্ন: আপনি প্রশাসনে আসতে চাচ্ছেন।
আপনাকে যদি সেখানে পদায়ন দেওয়া হয়, আপনি কী করবেন?
উ: আমি প্রথমে অ্যানালাইসিস করব, সেখানে কতটুকু পাথর আছে এবং কতটুক পর্যন্ত উত্তোলন করা পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ হবে না।
এরপর যাঁরা ইজারা নেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারিভাবে ইজারা দেব এবং লিমিট করে দেব যে কতটুক পর্যন্ত উত্তোলন করা যাবে।
(সম্পূরক প্রশ্ন করেছিলেন – প্রশ্নটা মনে নেই) উ: উজান থেকে যেহেতু পাথরগুলো আসে, সেহেতু নদীর ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে, আবার পাথর বেশি জমে গেলে নদীর নাব্যতা যাতে নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
Leave a Reply