ঢাকা ১১:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ভূরুঙ্গামারীতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে জাতীয় সমবায় দিবস পালন ভূরুঙ্গামারীতে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপির বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত নীলফামারীতে পৃথক দুই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১, আহত ৪ বিরলে বিএনপির আয়োজনে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপন নওগাঁয় ডিসি গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের পর্দা উঠছে ১০ নভেম্বর নাগেশ্বরীতে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল নওগাঁয় ইট প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো র‍্যাগিং চলবে না-উপাচার্য হাসানাত আলী কাউনিয়ায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপির আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও র‍্যালি সরিষাবাড়ীতে ৫৫তম জাতীয় সমবায় দিবস পালিত

দারুল আদালত: চট্টগ্রামের চারশ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:২১:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫১ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রামের চকবাজারে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক দারুল আদালত ভবনটি নির্মাণকাল ও স্থাপত্যশৈলী নিয়ে আজও রয়েছে নানা রহস্য ও বিতর্ক।

(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চট্টগ্রাম শহরের কোলাহলপূর্ণ চকবাজার এলাকার সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের পাহাড়চূড়ায় সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ‘দারুল আদালত’ নামে পরিচিত এক ঐতিহাসিক স্থাপনা। স্থানীয়ভাবে এটি পর্তুগিজ ভবন নামেও পরিচিত। ব্রিটিশ শাসনামলে এটি চট্টগ্রামের প্রথম আদালত ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। দারুল আদালত শব্দের আভিধানিক অর্থ বিচারালয় ভবন। ব্রিটিশ শাসনের সূচনালগ্নে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এটি নির্মিত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়। তবে ১৮৫৭ সালের দিকে লালদিঘীর পাড়ের রেড বিল্ডিং বা লালকুঠিতে আদালত স্থানান্তরিত হলে এই ভবনের বিচারিক ভূমিকা শেষ হয়।

এই ভবনের নির্মাণকাল নিয়ে রয়েছে বেশ কিছু মতভেদ। প্রচলিত লোককথায় একে পর্তুগিজদের তৈরি এবং প্রায় ১৬৬৬ সালের দিকের স্থাপনা হিসেবে দাবি করা হয়। তবে ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরীর গবেষণায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাঁর মতে, ব্রিটিশ শাসনাধীন চট্টগ্রামে ১৭৬১ সালের দিকে ভবনটি তৈরি হয়েছিল। ভবনটির স্থাপত্যশৈলীও বেশ রহস্যময়। ২০০৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও কলেজ কর্তৃপক্ষের যৌথ জরিপে দেখা যায়, এর নির্মাণশৈলী মুঘল, ব্রিটিশ বা আধুনিক স্থাপত্যের সাথে হুবহু মেলে না। এতে ইউরোপীয় ও স্থানীয় স্থাপত্যের অদ্ভুত এক সংমিশ্রণ রয়েছে, যা একে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

ভবনটির সাথে জড়িত রয়েছে অনেক কিংবদন্তি। এর দুইতলার ওপরের টাওয়ারগুলো থেকে অতীতে কর্ণফুলী নদী ও আশেপাশের এলাকার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হতো বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। এছাড়া এর নিচ থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত সুড়ঙ্গ থাকা এবং গোপন কক্ষ থাকার মতো অনেক রোমাঞ্চকর গল্প স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। যদিও এসব লোককথার পেছনে কোনো জোরালো প্রামাণ্য ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেকে আবার এই ভবনটি পর্তুগিজ জলদস্যুদের দুর্গ হিসেবে ব্যবহারের তত্ত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

দারুল আদালতের ইতিহাস কেবল বিচারব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি পরবর্তীতে শিক্ষার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ১৮৭৪ সালে মহসিন ফান্ডের সহায়তায় চট্টগ্রাম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীকালে ১৯২৭ সালে এটি ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে রূপান্তরিত হয়। ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে পাহাড়সহ এই ভবনটি কিনে নেয় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকেই ভবনটি বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। অবশেষে ১৯৭৯ সালের ২০ জুলাই ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ও সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ মিলে বর্তমানের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ গঠিত হয়।

দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাকার্যক্রমের সাথে যুক্ত থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় ভবনটির জরাজীর্ণ দশা শুরু হয়। অবশেষে ২০০২ সালে এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং এর একাডেমিক ও প্রশাসনিক সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সেখানে নিষিদ্ধ। মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভবনটি প্রায় ৪০০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে এবং বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

দারুল আদালতের গুরুত্ব কেবল একটি ইট-চুন-সুরকির পুরনো স্থাপনা হিসেবে নয়। এটি চট্টগ্রামের ঔপনিবেশিক শাসন, বিচারিক ও শিক্ষাব্যবস্থার বিবর্তন এবং নগর ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। যদিও এর নির্মাণকাল ও প্রচলিত লোককথা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে চট্টগ্রামের এই গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনটি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এই ভবনটিকে সংস্কার বা সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নগরের অতীত ও ঐতিহাসিক স্থাপত্যের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হতো। প্রতিটি দেয়াল যেন চট্টগ্রামের হারানো সময়ের একেকটি নীরব অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

দারুল আদালত: চট্টগ্রামের চারশ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী

আপডেট সময় : ০১:২১:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রাম শহরের কোলাহলপূর্ণ চকবাজার এলাকার সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের পাহাড়চূড়ায় সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ‘দারুল আদালত’ নামে পরিচিত এক ঐতিহাসিক স্থাপনা। স্থানীয়ভাবে এটি পর্তুগিজ ভবন নামেও পরিচিত। ব্রিটিশ শাসনামলে এটি চট্টগ্রামের প্রথম আদালত ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। দারুল আদালত শব্দের আভিধানিক অর্থ বিচারালয় ভবন। ব্রিটিশ শাসনের সূচনালগ্নে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এটি নির্মিত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়। তবে ১৮৫৭ সালের দিকে লালদিঘীর পাড়ের রেড বিল্ডিং বা লালকুঠিতে আদালত স্থানান্তরিত হলে এই ভবনের বিচারিক ভূমিকা শেষ হয়।

এই ভবনের নির্মাণকাল নিয়ে রয়েছে বেশ কিছু মতভেদ। প্রচলিত লোককথায় একে পর্তুগিজদের তৈরি এবং প্রায় ১৬৬৬ সালের দিকের স্থাপনা হিসেবে দাবি করা হয়। তবে ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরীর গবেষণায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাঁর মতে, ব্রিটিশ শাসনাধীন চট্টগ্রামে ১৭৬১ সালের দিকে ভবনটি তৈরি হয়েছিল। ভবনটির স্থাপত্যশৈলীও বেশ রহস্যময়। ২০০৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও কলেজ কর্তৃপক্ষের যৌথ জরিপে দেখা যায়, এর নির্মাণশৈলী মুঘল, ব্রিটিশ বা আধুনিক স্থাপত্যের সাথে হুবহু মেলে না। এতে ইউরোপীয় ও স্থানীয় স্থাপত্যের অদ্ভুত এক সংমিশ্রণ রয়েছে, যা একে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

ভবনটির সাথে জড়িত রয়েছে অনেক কিংবদন্তি। এর দুইতলার ওপরের টাওয়ারগুলো থেকে অতীতে কর্ণফুলী নদী ও আশেপাশের এলাকার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হতো বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। এছাড়া এর নিচ থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত সুড়ঙ্গ থাকা এবং গোপন কক্ষ থাকার মতো অনেক রোমাঞ্চকর গল্প স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। যদিও এসব লোককথার পেছনে কোনো জোরালো প্রামাণ্য ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেকে আবার এই ভবনটি পর্তুগিজ জলদস্যুদের দুর্গ হিসেবে ব্যবহারের তত্ত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

দারুল আদালতের ইতিহাস কেবল বিচারব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি পরবর্তীতে শিক্ষার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ১৮৭৪ সালে মহসিন ফান্ডের সহায়তায় চট্টগ্রাম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীকালে ১৯২৭ সালে এটি ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে রূপান্তরিত হয়। ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে পাহাড়সহ এই ভবনটি কিনে নেয় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকেই ভবনটি বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। অবশেষে ১৯৭৯ সালের ২০ জুলাই ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ও সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ মিলে বর্তমানের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ গঠিত হয়।

দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাকার্যক্রমের সাথে যুক্ত থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় ভবনটির জরাজীর্ণ দশা শুরু হয়। অবশেষে ২০০২ সালে এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং এর একাডেমিক ও প্রশাসনিক সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সেখানে নিষিদ্ধ। মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভবনটি প্রায় ৪০০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে এবং বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

দারুল আদালতের গুরুত্ব কেবল একটি ইট-চুন-সুরকির পুরনো স্থাপনা হিসেবে নয়। এটি চট্টগ্রামের ঔপনিবেশিক শাসন, বিচারিক ও শিক্ষাব্যবস্থার বিবর্তন এবং নগর ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। যদিও এর নির্মাণকাল ও প্রচলিত লোককথা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে চট্টগ্রামের এই গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনটি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এই ভবনটিকে সংস্কার বা সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নগরের অতীত ও ঐতিহাসিক স্থাপত্যের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হতো। প্রতিটি দেয়াল যেন চট্টগ্রামের হারানো সময়ের একেকটি নীরব অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।

Facebook Comments Box