মহাবিপন্ন তালিকায় চালমুগরা, কমছে বনের এই ঔষধি বৃক্ষ
- আপডেট সময় : ১২:২১:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
মহাবিপন্ন তালিকায় চালমুগরা, কমছে বনের এই ঔষধি বৃক্ষ
প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা সুদর্শন বৃক্ষ চালমুগরা বা ডালমুগরি এখন মহাবিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ২০১৪ সালে প্রথম এই গাছটি ঢাকার মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে চোখে পড়ে। পরবর্তী সময়ে খাগড়াছড়ির আলুটিলা ডাউনের প্রাকৃতিক পরিবেশে গাছটিকে দেখার সুযোগ হয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম এবং আইইউসিএন-এর প্রকাশিত রেড লিস্টে গাছটিকে মহাবিপন্ন উদ্ভিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। রেড লিস্টে মহাবিপন্নতার তথ্য দেখে আবার গাছটির কথা মনে পড়ল।
দেশের বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন বনাঞ্চলে এই গাছের দেখা পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে মাত্র ১০টি স্থানে এই বৃক্ষটি টিকে আছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২২ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, প্রতিটি স্থানে মাত্র ১ থেকে ৩টি পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ বিদ্যমান এবং সেগুলোও বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে।
এলাকাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকা উদ্ভিদের মোট সংখ্যা ১০০টিরও নিচে নেমে গেছে। প্রতিটি স্থানে গড়ে ৫টিরও কম উদ্ভিদ রয়েছে, যা কোনো উদ্ভিদের ‘অত্যন্ত বিপন্ন’ হওয়ার সূচকের চেয়ে অনেক কম। এই দ্রুত বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর বীজের অত্যধিক আহরণ।
এছাড়া প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধির হারও অত্যন্ত কম। বাংলাদেশ ও ভারতে গত ১০ বছরে এই প্রজাতির সংখ্যা ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বর্ণিত স্থানগুলোর উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রাকৃতিক আবাসে মোট উদ্ভিদের সংখ্যা ১০০–এর কম পাওয়া গেছে। গড়পড়তা প্রতিটি স্থানে এই সংখ্যা ৫-এর নিচে; যা ‘অত্যন্ত বিপন্ন’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার নির্ধারিত সূচকের চেয়েও অনেক কম। বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রাকৃতিক উৎস থেকে গাছ সংগ্রহ করা হলেও, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকা এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দক্ষিণ আমেরিকার মতো অঞ্চলেও এ গাছ চাষাবাদ করা হয়।
চালমুগরা বা Hydnocarpus kurzii একটি চিরসবুজ মাঝারি আকারের গাছ, যা ১২ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর কাণ্ড সরল ও গোলাকার এবং বাকল মসৃণ ও পুরু হয়। পাতাগুলো গাঢ় সবুজ রঙের, পুরু এবং ভল্লাকার। গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা ঋতুতে এই গাছে হালকা হলুদ রঙের সুগন্ধি ফুল ফোটে। হেমন্তকালে ফল পরিপক্ব হয়, যার ভেতর বীজ থাকে।
আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের বৃক্ষ হিসেবে এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত জন্মাতে পারে। দিনে ২৮ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে এটি ভালো জন্মে। সুনিষ্কাশিত বেলে-পলিযুক্ত সমতল ভূমি এর বৃদ্ধির জন্য আদর্শ।
পাতা পুরু, ভল্লাকার বা আয়ত ভল্লাকার, আগা সুচালো, কিনারা সমান, তবে পাতার দুই পাশ ঢেউখেলানো। ফল গোলাকার, পাকা ফল শক্ত, পুরু ও বাদামি। পূর্ণ সূর্যালোক এবং হালকা ছায়াযুক্ত স্থানও পছন্দ।
ঔষধি গুণের দিক থেকে চালমুগরা একটি মহৌষধ। চুলকানি বা ত্বকের লালচে ভাব দূর করতে এর তেল অত্যন্ত কার্যকর। কুষ্ঠরোগের ক্ষেত্রেও এর বীজতেল গরম করে ব্যবহার করলে উপশম পাওয়া যায়। এছাড়া আমাশয় নিরাময়ে এর পাতা সেদ্ধ পানি পান করা উপকারী। খুশকি দূর করতে চুলে চালমুগরার তেল ব্যবহার করে আধা ঘণ্টা রেখে ধুয়ে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ডায়াবেটিসের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিদিন সকাল-বিকেল ১ গ্রাম বীজগুঁড়া গরম পানির সঙ্গে সেবন করলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। খোসপাঁচড়া ও সাধারণ ঘা সারাতে মৌচাকের মোমের সঙ্গে তেল মিশিয়ে মলম তৈরি করা যায়।
এমনকি চীন ও আর্জেন্টিনায় ক্যানসার চিকিৎসাতেও এই তেল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শরীরের কোথাও চুলকানি বা চুলকানির কারণে শরীর লাল হয়ে ফুলে গেলে চালমুগরার তেল চুলকানির স্থানে ভালোভাবে লাগিয়ে দিলে দ্রুত ভালো ফল পাওয়া যাবে।
স্থানীয় পর্যায়ে বান্দরবানের পলি ও রেমাক্রি প্রাংসা, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, হাজারীখিল, বারোইয়াধলা ও ধোপাছড়ি, কক্সবাজারের ভোমারিঘোনা, খাগড়াছড়ির আলুটিলা, রাঙামাটির রামপাহাড়, দামাইছড়ি, ফারুয়া, কাসালং-মাসালং, পাবলাখালী এবং মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া ও শ্রীমঙ্গলে এই গাছ দেখা যায়। আশার কথা হলো, সম্প্রতি কয়েকটি স্থানে নতুন করে গাছ রোপণ করা হয়েছে। প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেনের মতে, বিলুপ্তপ্রায় এই বৃক্ষ রক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।


























