বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাতে সরকারের মহাপরিকল্পনা
- আপডেট সময় : ০২:২৮:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাতে সরকারের মহাপরিকল্পনা
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ বাড়াতে এবং বৈচিত্র্য আনতে সরকার একটি ব্যাপক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো অপ্রথাগত শ্রমবাজারগুলোতে দক্ষ কর্মী পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বহুগুণ বৃদ্ধি করা। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এক কোটি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।
নতুন এই মহাপরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো উন্নত বিশ্বের বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। এর আওতায় মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপের ইতালি, জার্মানি, গ্রিস, রোমানিয়াসহ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
পড়ুন>>মিরসরাইয়ে মৃতদের টাকা আত্মসাৎ, সাবেক চেয়ারম্যানসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা
এছাড়া নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে দালালচক্র নির্মূল এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের এই সময়ে বৈদেশিক আয়ের ভিত্তি সুদৃঢ় করে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ দেশের বেকারত্ব দূরীকরণের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে গতি আনতে বর্তমানে সারাদেশে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) কাজ করছে।তথ্যপ্রযুক্তি, নার্সিং, আধুনিক ড্রাইভিং, কেয়ারগিভিং, ইলেকট্রিক্যাল ও হসপিটালিটিসহ ৫৫টি বিশেষায়িত কোর্সে তরুণ-তরুণীদের দক্ষ করে তোলা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে তরুণ ও যুবকদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পড়ুন>>মিরসরাইয়ে মৃতদের টাকা আত্মসাৎ, সাবেক চেয়ারম্যানসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা
আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ইংরেজি ছাড়াও জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান ও আরবি ভাষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ সার্টিফিকেশন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এই ধারা আরও শক্তিশালী করতে অদক্ষ শ্রমিকের বদলে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী (এসএসডব্লিউ) নিয়োগসংক্রান্ত চুক্তিও কার্যকর রয়েছে।
কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর রূপরেখা ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন এ প্রক্রিয়ায় ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ হবে। এছাড়া বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ জিরো-কস্ট বা বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী নিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। এই পাইলট প্রকল্পটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল-এর তত্ত্বাবধানে চলছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আইএলও-র যৌথ উদ্যোগে ‘সাপোর্টিং আ ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ উইথ বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ইউরোপে দক্ষ কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম চলছে। বোয়েসেল ও বিএমইটি-র ডেটাবেজ ব্যবহার করে ইউরোপীয় নিয়োগদাতাদের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। ইতালি সরকারের সহায়তায় ইতিমধ্যে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
জার্মানির নতুন ‘অপরচুনিটি কার্ড’ বা ‘চান্সেনকার্টে’ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৌশলী ও আইটি পেশাজীবীরা সরাসরি দেশটিতে চাকরি খোঁজার সুযোগ পাচ্ছেন। একইভাবে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবায় নার্স ও কেয়ারগিভার নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া ও পর্তুগালে কৃষি ও সরবরাহ খাতে দক্ষ কর্মীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পূর্ব ইউরোপের রোমানিয়া, গ্রিস, সার্বিয়া, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরি কৃষি, সরবরাহব্যবস্থা, ডেলিভারি সেবা এবং আতিথেয়তা খাতে বৈধভাবে দক্ষ কর্মী পাঠানোর গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
পড়ুন>>মানুষ কি নিরামিষাশী না মাংসাশী? বিজ্ঞান কী বলছে
ওশেনিয়া অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে কৃষি ও নির্মাণ খাতে কোটাভিত্তিক কর্মী পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া রাশিয়া ও ইউরেশিয়ার উৎপাদনশিল্প এবং মালদ্বীপের পর্যটন খাতেও বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে। পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউরেশিয়ার পোশাক ও উৎপাদনশিল্পে অধিক মূল্য সংযোজনমূলক কারিগরি পদের কর্মসংস্থানের সুযোগও প্রতিবছর বাড়ছে।
অভিবাসন ব্যয় হ্রাস ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ডিজিটাল ‘মাইগ্র্যান্ট কার্ড’ চালু করেছে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা ব্যাংকিং সুবিধা, বিমা সুরক্ষা এবং জরুরি আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদেশগামীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে সরকার সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকার সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্মপরিবেশ ও আইনি ব্যবস্থাপনার মান কঠোরভাবে যাচাই করে কর্মী পাঠাতে চায়, যাতে প্রবাসীরা কর্মক্ষেত্রে শোষণমুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ পান। একই সঙ্গে অননুমোদিত মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা কার্যকর করছে সরকার।
























